Explainer

দেশে দেশে ছাত্র আন্দোলন

“Consciousness is only possible through change; change is only possible through movement.”- Aldous Huxley.

বিশ্বজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের ধারণাটি একদম ই নতুন নয়। যুগে যুগে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ এবং পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। ফরাসী বিল্পব থেকে ইউরোপজুড়ে গণতন্ত্র প্রত্যাশী আন্দোলন, জার্মানির বার্লিন দেয়াল পতন থেকে ভারত ও রোমানিয়ার দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন এই সকল ক্ষেত্রেই ছাত্ররা রেখেছে গুরত্বপূর্ণ অবদান।

পরিবর্তন এবং সংস্কারকামী আন্দোলনগুলো সব সময়ই ছাত্রজনতার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। সম্ভবত এটির পেছনে গুরত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসবে কাজ করে তরুণদের নির্দ্বিধায় ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতা। হয়তোবা এটির আরও একটি কারণ হলো যাদের জীবনের অনেকটাই বাকি পড়ে আছে তাদের চোখেই সমাজ ও রাষ্ট্রের যাবতীয় ত্রুটি বিচ্যু্তি সমূহ সূক্ষ্ণভাবে ধরা পড়ে এবং তারা সেই বিচ্যুতি গুলোর বিলোপ সাধনে উদ্যমী হয়। সেটি কখনও হতে পারে প্রকাশ্য বিদ্রোহ কখনও বা মৌন প্রতিবাদের মাধ্যমে। কারণগুলো যাই হোক না কেন, প্রতিবাদীর ভুমিকায় অংশ্রগ্রহণের ক্ষেত্রে তরুণরা এগিয়ে থাকে।

মার্টিন লুথার কিং প্রতিবাদী ভূমিকায় অবর্তীন হয়েছিলেন তার বিশ বছর বয়স থেকেই। মার্ক্স-এঙ্গেলস তাদের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো প্রকাশ করেছিলেন তাদের বয়স যখন ছিলো যথাক্রমে মাত্র ৩০ এবং ২৮। এবং বর্তমানেও অসংখ্য আন্দোলনের ই সূচনা ঘটায় এসব তরূণ শিক্ষার্থীরা এবং অনেক সামাজিক আন্দোলনই তরুণদের সক্রিয় নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। বিশেষ করে, ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বৈষম্য ও  অনায্যতাকে প্ল্যাটফর্ম হিসাবে ব্যবহার করে যুদ্ধ, দারিদ্র, বর্ণবাদ ও অন্যান্য বৈষম্য দূরীকরণের আন্দোলনগুলো এই তরুণদের মাধ্যেমেই নতুন মাত্রা পায়।

প্রতিবাদ বা আন্দোলন কি ?

লেখাটির মূল সুর বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই আন্দোলন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা জানা থাকা প্রয়োজন। সামাজিক আন্দোলনকে একটি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করা যায় যেখানে বহু সংখ্যক মানুষ একত্রে মিলে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে চায় অথবা এইসব ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনকে বাঁধাগ্রস্ত করতে চায়।

সমাজবিজ্ঞানী চার্লস টিলি (Charles Tilly) আন্দোলনকে সঙ্গায়িত করেছেন এভাবে, “সামাজিক আন্দোলন হলো একটি ধারাবাহিক বিতর্কমূলক কার্যক্রম, প্রদর্শনী এবং প্রচারণা যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সংঘবদ্ধভাবে কোন বিষয়ে জোর দাবি জানায়”। টিলি আরও বলছেন, “সামাজিক আন্দোলন হলো জনরাজনীতিতে অংশগ্রহণের জন্যে সাধারণ মানুষের বাহন”।

“Social movements is a series of contentious performances, displays and campaigns by which ordinary people make collective claims on others. Social movements are a major vehicle for ordinary people’s participation in public politics.”

সামাজিক আন্দোলনের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে, কোন আন্দোলন হয় সর্বাত্মক- যেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকে, কোনটি হয় নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠি কেন্দ্রীক যেমন- শ্রমিক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন ইত্যাদি। সহিংসতার মাত্রা বিবেচনায় ও আন্দলোনের মাঝে তারতম্য হয়, কোনটি অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী রূপ নেয় আবার কোন আন্দোলন সম্পুর্ণটিই থাকে শান্তিপূর্ণ।

সেই অর্থে ছাত্র আন্দোলন অভিধাটি দেয়া যায় সেসব আন্দোলন কে যেসবে ছাত্র সমাজ সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদে অংশগ্রহণ করে।

দেশে দেশে ছাত্র আন্দোলনঃ

যুগে যুগে সংগঠিত বিভিন্ন দেশের ছাত্র আন্দোলনগুলো সম্পর্কে এই পর্যায়ে আলোকপাত করা হচ্ছে।

১। মার্চ ফর আওয়ার লাইভস (March For Our Lives) :

সমসাময়িক সময়ের সবচাইতে আলোচিত এবং ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক আন্দোলনগুলোর মাঝে অন্যতম একটি হল যুক্তরাষ্ট্রের “মার্চ ফর আওয়ার লাইভস”। ছাত্রকেন্দ্রিক তুমুল আলোচিত এই আন্দোলনটির সূচনা ঘটে মূলত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তে ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডে মারজরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলে (Marjory Stone-man Douglas High School)  অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীর অতর্কিত হামলায় ১৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। প্রাথমিক অবস্থায় নিহত শিক্ষার্থীদের সহপাঠিরা বিদ্যমান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের সংস্কারের দাবি তুললে এটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ইতোমধ্যে ছাত্রদের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে যথাক্রমে মার্চের ২৪ ও এপ্রিলের ২০ তারিখে ন্যাশনাল স্কুল  ওয়াক আউট (National School Walkout) অনুষ্ঠিত হয়। এবং এরপরও দাবি না মানায় চুড়ান্তভাবে ওয়াশিংটন ডি.সি. সহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে “মার্চ ফর আওয়ার লাইভস” শিরোনামে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইনকে ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সরকারকে এ বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

২। তিয়েন আনমেন স্কয়ার (Tiananmen Square:

১৯৮৯ এর ১৮ ই এপ্রিল কমিউনিস্ট নেতা হু ইয়োবাং (Hu Yaobang) এর মৃত্যুতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বেইজিং এর তিয়েন আনমেন স্কয়ারে জড়ো হয় এবং অত্যাচারি কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে থাকে। শিক্ষার্থীরা অবরোধ এবং ক্লাস বর্জনের ঘোষনা দিলে আন্দোলন দীর্ঘায়িত হতে শুরু করে।

এর কয়েক সপ্তাহ পরে কমিউনিস্ট সরকারকে শিক্ষার্থিদের সাথে সংলাপে বসার জন্য বাধ্য করতে একই তিয়ান আনমেন স্কয়ারে শিক্ষার্থীরা অনশনে বসেন। অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে আন্দোলন কারীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। একই বছরের ১৯ মে আর্থ সামাজিক পরিবর্তনের দাবিকে সামনে রেখে প্রায় ১২ লাখ আন্দোলনকারীর অংশগ্রহনে একটি বিশাল র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয় যেখানে অংশগ্রহণকারীর সিংহভাগ ই ছিলো শিক্ষার্থী। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০ মে থেকে চীন সরকার ‘মার্শাল ল’ জারী করে কিন্তু কোন লাভ হয় না।

অতঃপর, ৪ জুন আন্দোলনকারীদের উপরে চায়না পুলিস গুলি এবং প্রহার আরম্ভ করে। আতংকিত বিক্ষোভকারীরা পালিয়ে যাওয়ার জন্যে যত্রতত্র দৌড়ঝাপ শুরু করলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে, যখন দৃশ্যপটে মিলিটারি ট্যাংক  আবির্ভুত হয় এবং অবশিষ্ট বিক্ষোভকারীদের উপরে চড়াও হয়। এই ঘটনায় দাপ্তরিকভাবে কোন হতাহতের ঘটনা স্বীকার করা না হলেও পশ্চিমা সংবাদকর্মীরা আনুমানিক এক হাজার নিহতের এবং দশ হাজারের বেশি গ্রেপ্তারের কথা রিপোর্ট করেন। বর্বইর এই আক্রমণ সারা বিশ্বের নজর কাড়ে এবং ফল হিসেবে চাইনিজ কমিউনিস্ট সরকারের উপরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

৩। সোয়েটো বিদ্রোহ (Soweto Uprising):

১৯৭৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিন আফ্রিকার সোয়েটোয় হাজার হাজার স্কুল শিক্ষার্থী বর্ণবাদ ও কালো বর্ণের মানুষদের শিক্ষা অধিকার সীমিতকারী – চরম বৈষম্যবাদী বান্টু শিক্ষা আইনের (Bantu Education Act) বিরুদ্ধে শান্তিপুর্ণ আন্দোলন শুরু করে।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সেখানের একটি ফুটবল স্টেডিয়ামের দিকে এগুতে থাকলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্যেশ্যে টিয়ারশেল এবং ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। এতেও কোন কাজ না হলে তারা শিক্ষার্থীদের উপরে সরাসরি গুলি বর্ষণ করে এতে দুজন নিহত সহ শতাধীক স্কুল শিক্ষার্থী আহত হয়।

এই ঘটনা সারা দেশ জুড়ে ব্যপক গণরোষের জন্ম দেয় এবং দলে দলে মানুষ আন্দোলনের জন্যে নেমে পড়ে। এতে করে দক্ষীন আফ্রিকার পুলিশ বাহিনী আইন শৃঙ্খলা রক্ষার নামে আন্দোলন কারীদের উপরে সাঁজোয়া যান এবং ট্যাংক দিয়ে আক্রমণ চালায়। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহ সারা দক্ষীন আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়লে সেটি সারা বিশ্বের নজরে আসে এবং বর্ণবাদ বিরোধী আন্দলোনের প্রতি দক্ষীন আফ্রিকার শাসক গোষ্ঠীর বর্বরতাকে সারা বিশ্বের কাছে উন্মোচিত করে দেয়।

৪। হোক কলরব (Hok Kolorob) :

২০১৪ সালের ‘হোক কলরব’ আন্দোলন বা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় ভারতের কলকাতা শহরের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু ছাত্রের বিরুদ্ধে তার উপর শ্লীলতাহানির অভিযোগ আনলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগের যথাযথ মর্যাদা দেননি বলে জানা যায়। কর্তৃপক্ষের কাছে এই ঘটনার নিরপেক্ষ বিচারের দাবি নিয়ে প্রতিবাদে এগিয়ে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্রছাত্রী। এরপর তাদের এই ধারাবাহিক বিক্ষোভ ও অবস্থানের খবর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ফেসবুক এবং অন্যান্য সোশাল মিডিয়ায়, যেখানে প্রতিবাদজনিত যাবতীয় সংবাদ পর্যায়ক্রমিক ভাবে সম্প্রচারিত হতে থাকে #হোক কলরব (#hokkolorob) হ্যাশট্যাগের সাথে। সেপ্টেম্বরের ১৬ তারিখ অব্দি ঘটতে থাকা ধারাবাহিক বিক্ষোভের পরও সমঝোতার সিদ্ধান্তে না-পৌঁছনো গেলে উপাচার্য সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু অধ্যাপককে ঘেরাও করেন বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের দল।

১৭ তারিখ মধ্যরাত্রে এই বিক্ষোভ সামলানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পুলিশের দল আসে এবং নির্মম ভাবে লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের উপর। পুলিশের লাঠিচার্জের সাথে সাথে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মচারীরাও ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে ছাত্র দের গায়ে হাত তোলেন বলে জানা যায়। সংঘর্ষে গুরুতর ভাবে জখম হন ৪০ জন ছাত্র, সাথে গ্রেপ্তার করা হয় ৩৭ ছাত্রকে। এই ঘটনা সংবাদমাধ্যম, ফেসবুক এবং সোশাল মিডিয়ায় সম্প্রচারিত হলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিবাদ সংক্রামিত হতে থাকে কলকাতার বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। আন্দোলনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে দিল্লি, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, বেংগালুরু সহ ভারতের বিভিন্ন শহরের আপামর ছাত্রসমাজ। আন্দোলনের ঢেউ এমনকি ছড়াতে থাকে দেশের বাইরেও। অচিরেই ‘হোক কলরব’ শব্দবন্ধটি হয়ে যায় বিশ্বব্যাপী এক ছাত্র আন্দোলনের মুখে মুখে ফেরা স্লোগান। ১৭ তারিখের পর থেকেই ধারাবাহিক ভাবে নানান মিছিল সংগঠিত হতে থাকে কোলকাতা শহরে, তা বিপুল আকার নেয় ২০ সেপ্টেম্বরের মহামিছিলে। ঐদিন দুপুর ২ টায় নন্দন থেকে যে মিছিলটি বেরোয় তাতে হাঁটতে দেখা যায় অসংখ্য মানুষকে, কোলকাতা শহরের বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তো বটেই, মিছিলে ওদের সমর্থনে পা মেলান নানা বয়সের ও নানা পেশার মানুষও। মিছিলের শেষে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে কয়েকজনের প্রতিনিধিদল দল যখন দেখা করেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সাথে, বাকিরা তখন অবস্থানে বসেন কলকাতার মেয়ো রোডে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কর্তৃক প্রচারিত পরিসংখ্যানগুলি থেকে অনুমান করা যায় ঐদিনে মিছিলের জনসমুদ্রে ছিলেন ত্রিশ হাজার থেকে এক লক্ষ মানুষ। বিক্ষুব্ধ মানুষের জোট ঐদিন একসাথে দাবি জানিয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতে লাঠিচার্জের মত ঘটনার প্রতিবাদে তার যোগ্য বিচার হিসেবে উপাচার্য অভিজিত চক্রবর্তীর পদত্যাগ এবং নির্যাতিতা মেয়েটির শ্লীলতাহানির উপযুক্ত নিরপেক্ষ তদন্ত জন্য।

৫। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (Anti Vietnam war Movement) :

১৯৫৫ তে শুরু হওয়া বিতর্কিত ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ২০ লক্ষ নতুন সেন্য নিয়োগ দেওয়া হয় মার্কিন আর্মিতে। এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৬০ সালের দিকে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হয় আমেরিকাতে এবং স্বাভাবিকভাবেই তরুণসমাজ এই আন্দোলনের নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এই ছাত্র আন্দোলনই মূলত আমেরিকার জনগণকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে সাহায্য করে। আন্দোলনের কর্মসূচি হিসাবে ছাত্ররা সারা আমেরিকা জুড়ে মিছিল,  অবস্থান ধর্মঘট এবং জনগণকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহায্য করে । এই আন্দোলন বিদ্যুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনগণও ছাত্রদের আন্দোলন করাকে কেন্দ্র করে দুই ভাগে অর্থাৎ ছাত্রদের আন্দোলনের অনুমতি দেওয়া এবং না দেওয়া নিয়ে ভাগ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন যাবত চলা এই আন্দোলনে ১৯৭০ সালের ৪ ই মে Kent State University তে এমনিই একটি প্রতিবাদ মিছিল,যে সময় বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, ওহিও ন্যাশনাল গার্ডের গুলিতে ৪ জন তৎক্ষণাৎ মারা যায় এবং ৯ জন আহত হয়,তা ছাড়াও ব্যাপক টিয়ারগ্যাসও নিক্ষেপ করা হয় তাদের প্রতি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে জনগণের আস্থা হারানোর কারণে ভিয়েতনাম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারকে ত্বরান্বিত করে,এবং এর আরেকটি ফলাফল হিসাবে বিবেচনা করা হয় ভোটাধিকারকে ১৮ তে নামিয়ে আনা।

৬। আমব্রেলা মুভমেন্ট হংকং (Umbrella Movement Hongkong): 

হংকং, একটি সাবেক ব্রিটিশ কলোনি যার লোকসংখ্যা প্রায় ৭ মিলিয়ন। এটি ১৯৯৭ সালের দিকে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসন থেকে মুক্ত হয়ে চীনের অধীনে চলে যায় এবং “এক দেশ, দুই ব্যবস্থা (One country, two systems)” তত্ত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হতে থাকে। এই তত্ত্বের নীতি অনুসারে, বেইজিং শুধুমাত্র হংকং শহরের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়ে দায়বদ্ধ থাকে। একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ ও অবাধ প্রেস থাকা সত্ত্বেও হংকং সীমিত স্বশাসন এবং নাগরিক অধিকার ভোগ করে।

২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট National People’s Congress of China (NPCSC) নির্বাচনের জন্য একটি কাঠামো নির্ধারণ করে  যেখানে ২০১৭ তে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাহী প্রধান নির্বাচনে সার্বজনীন ভোটাধিকার কে সীমিত করা হয় এবং প্রার্থী হওয়ার জন্য বেইজিং সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে যেখানে  ১২০০ মেম্বারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই নির্বাহী প্রধানের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হওয়ার কথা বলা হয়। জনগণ তাদের দাবী কে উপেক্ষিত হতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত  Hong Kong Federation of Students (HKFS) এবং Scholarism এর নেতৃত্বে ছাত্রদের ক্লাস বর্জন্ এবং ধর্মঘট পালন করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বরে একটি পাবলিক চত্ত্বরকে গণতন্র চত্ত্বর দাবী করে জড়ো হতে শুরু করে এবং রাস্তা দখল করে শহর অচল করে দেয়।

পরবর্তি ২৭-২৯ তারিখ পুলিশ বিক্ষোভকারীদের উপর টিয়ার গ্যাস ও পেপার স্প্রে ব্যবহার শুরু করে আর বিক্ষোভকারীরা নিজেদেরকে পেপার স্প্রে থেকে বাচাতে ছাতার ব্যবহার শুরু করে যা Umbrella মুভমেন্ট নামে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

লেখকঃ 
লেখাটি যৌথভাবে লিখেছেন, নাঈম আহমদ সিদ্দিক, তানজিম আহমেদ খান এবং আহমাদ নাবীল। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *