Explainer

রুশ বিপ্লব (Russian Revolution)

১.
১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর(নতুন ক্যালেন্ডারে ৭ নভেম্বর) লেনিনের বলশেভিক পার্টি সোভিয়েত বাহিনীর সহায়তায় রাশিয়ার রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নেয়। মার্ক্সীয় বিশ্ববীক্ষার উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম ঘটে যায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব;সর্বহারা কৃষক-শ্রমিকের বিপ্লব,প্রতিষ্ঠিত হয় প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব।লেনিন হাতে তুলে নেয় নতুন মানুষ,নতুন সমাজ গড়ার দায়িত্ব।পুঁজির শোষণ ও দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মানুষের মুক্তির জন্য যে সংগ্রাম তারই প্রত্যক্ষ ফল এই বিপ্লব।ফরাসি বিপ্লবের সাথে রুশ বিপ্লবের মূল তফাতটাই হচ্ছে শ্রেণীর স্বার্থের জায়গায়। ফরাসি বিপ্লব ছিলো বুর্জোয়া শ্রেণীর বিপ্লব,তাদের পুঁজি,ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও স্বার্থ রক্ষার বিপ্লব,আর অক্টোবরের রুশ বিপ্লব ছিলো ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সামাজিকীকরণের বিপ্লব।পুঁজির দৌরাত্ম্যকে ধ্বংস করার বিপ্লব। আর এ জায়গাতেই আমরা পাই মার্কসের ইতিহাস দর্শন। বুর্জোয়া বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশের পরই কেবল সম্ভব হয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। রুশ বিপ্লবও ছিলো মার্ক্সীয় ইতিহাস দর্শনেরই ফলশ্রুতি।১৯১৭ সালে বিপ্লব একটি ঘটেছিলো না, বিপ্লব ঘটেছিলো দুটি।ফেব্রুয়ারিতে একটা আর একটা অক্টোবরে। প্রথমটা বুর্জোয়া বিপ্লব আর দ্বিতীয়টা ছিলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।

২.
বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় রাশিয়া ছিলো অত্যন্ত পশ্চাৎপদ একটা রাষ্ট্র।সেখানে শিল্প ও পুঁজির বিকাশ ছিলো অত্যন্ত নিম্ন অবস্থায়।জারের নিষ্ঠুর রাজতান্ত্রিক শাসন এবং সামন্তবাদের নিকৃষ্ট কর্তৃত্ব রুদ্ধ করে ছিলো পুরো রুশ সমাজকে।শিল্পায়ন এবং পুঁজির বিকাশের জন্য রুশ সমাজে ফরাসি বিপ্লবের মতো একটি বুর্জোয়া বিপ্লব ছিলো অবশ্যম্ভাবী। আর তাই ১৯০৫ সালে বিপ্লবের ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছিলো বুর্জোয়া বিপ্লবের আসন্নতারই চিহ্ন। সেই বিপ্লবের রাস্তা করে দিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ(১৯১৪-১৯১৮)।যুদ্ধে রাশিয়া ছিলো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন ও ফরাসিদের সাথে।মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধই রুশ সমাজে বিপ্লবের গতিকে এতো ত্বরান্বিত করেছিলো। এ যুদ্ধের শেষের দিকে রাশিয়া মারাত্মক বিশৃঙ্খলা,বিভাজন এবং অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলো। জারের যুদ্ধবাজ নীতি তাঁর নিজেরই পতনের দিনক্ষণ এগিয়ে আনছিলো। যুদ্ধের জন্য জার নিকোলাস- ২ যেসব কৃষক-শ্রমিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছিলো,পরবর্তীতে তাঁরাই সশস্ত্র হয়ে অসংখ্য সোভিয়েত (The Soviets) বা কাউন্সিল গঠন করে তাঁর পতন অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

৩.
১৯১৭ এর ২৩-২৭ ফেব্রুয়ারিতে পেত্রোগ্রাদ (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবুর্গ) এবং সারাদেশে নারী-পুরুষ,সৈনিক-শ্রমিক-কৃষকেরা নির্বিশেষে রুটির জন্য রাস্তায় নামে,যা শেষে জারবিরোধী স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুথান রূপ নেয়।অন্যদিকে কসাক সৈণ্যবাহিনীও তাদের সহায়তা করে। তাতে করে ১ মার্চ জার নিকোলাস-২ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সবচেয়ে বড়ো সাফল্যই ছিলো জারতন্ত্রের পতন এবং বুর্জোয়াদের উথ্থান।জারের পতনের পর দুমা বা পার্লামেন্ট প্রিন্স জর্জেই লাবভ(Lvov) এর নেতৃত্বে অস্থায়ী কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করে যার বেশিরভাগ সদস্যই ছিলো রক্ষণশীল বুর্জোয়া।অন্যদিকে যুদ্ধ ফেরত সশস্ত্র কৃষক-শ্রমিকেরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য সোভিয়েত বা কাউন্সিল গঠন করে। এসব সোভিয়েতের বেশিরভাগই ছিলো মেনশেভিক ( রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি দুভাগে বিভক্ত ছিলো। একদিকে মেনশেভিক যারা মূলত সুবিধাবাদী অন্যদিকে বলশেভিক পার্টি,যারা ছিলো আমূল বিপ্লবী যার নেতৃত্বে ছিলেন লেনিন) প্রভাবাধীন । মূলত অস্থায়ী কেন্দ্রীয় সরকার ছিলো সোভিয়েতদের হাতের পুতুল। রাষ্ট্রব্যবস্থা চলছিল এক অদ্ভুত দ্বৈতশক্তির মাধ্যমে – সোভিয়েত এবং কেন্দ্রীয় সরকারের যৌথ পরিচালনায়।

৪.
এপ্রিল মাসে লেনিন নির্বাসন থেকে ফিরেই তিনি সোভিয়েতের হাতে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা দখলের উপর জোর দেন। তিনি সোভিয়েতে মেনশেভিকদের সুবিধাবাদী আচরণের তীব্র নিন্দা করেন। কিন্তু ঠিক ঐ সময়ে লেনিনের পক্ষে সোভিয়েতের উপর কর্তৃত্ব নেয়া সম্ভব ছিলো না।কারন তাঁর বলশেভিক পার্টি তখন পর্যন্তও সোভিয়েতে ছিলো সংখ্যলঘিষ্ঠ। যদিও সেপ্টেম্বরের আগেই তারা প্রায় বেশিরভাগ সোভিয়েতে ই প্রভাবশালী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
যে কারনে ১ মে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে আলেক্সান্ডার কেরেন্সকি যে জোট সরকার গঠন করে সেটা সোভিয়েত বাহিনীর তোপে টিকতেই পারে নি। মূলত এই সময়ে রাশিয়ার সমাজ এক গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো। ক্রমেই বলশেভিক বিপ্লবীদের প্রভাব সোভিয়েতে বেড়ে চলছিলো,অন্যদিকে মেনশেভিক এবং স্যোশাল রেভ্যুলশনারীদের প্রভাব কমে আসছিলো। শ্রমিক-কৃষকদের মধ্যেও বিরাজ করছিলো বিশৃঙ্খলা।জরুরি হয়ে পড়ছিলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার স্থিতিশীলতার।
সেপ্টেম্বর মাসে কসাক জেনারেল করনিলভ সামরিক ক্যু জারি করলে বলশেভিকদের জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল সহজ হয়ে যায়। লেনিন ১০ অক্টোবর অস্থায়ী কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা থেকে অপসারনের সিদ্ধান্ত নেন। তখন পেত্রোগ্রাদ ছিলো সোভিয়েত বিপ্লবীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল যার নেতা ছিলেন লেনিনের সহযোদ্ধা লিওন ট্রটস্কি।২৫ অক্টোবর বলশেভিক রেভ্যুলশনারীরা পেত্রোগ্রাদে উইন্টার প্যালেস আক্রমণ করে । অস্থায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের রক্তপাতহীন আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বলশেভিক পার্টি এবং সহযোগী শ্রমিক সোভিয়েতগুলো।২৬ অক্টোবর লেনিন সোভিয়েত সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেন। সমস্ত শিল্পকারখানা শ্রমিক সোভিয়েতদের নিয়ন্ত্রণে আসে। গঠন করা হয় বিপ্লবী রেড় ফোর্স।শুরু হয় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ।

৫.
সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে ছিলো সত্তর বছর। কেনো ভেঙ্গে গেলো সোভিয়েত ইউনিয়ন? কেনো থেমে গেলো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ ?স্টালিন পর কেনো আর এগোলো না সমাজতান্ত্রিক আদর্শ?কেনো শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বদলে প্রতিষ্ঠিত হলো একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র?
সে ভিন্ন প্রশ্ন। এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা যায়। ছোট্ট এই লেখায় কিভাবে পৃথিবীতে প্রথম শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র এলো সেটার দিকেই একটু আলোকপাত করা হয়েছে। শ্রমিক শ্রেণীর মহান নেতা লেনিনের শিক্ষা হচ্ছে জগতের সকল মেহনতি মানুষের মুক্তির শিক্ষা। বাস্তবে আমরা যাই দেখি না কেনো,এই শিক্ষা বা স্বপ্নের কথা ভুলে যাওয়া মানে গণমানুষের মুক্তির স্বপ্নের কথাই ভুলে যাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *