Explainer

গণতন্ত্র ঘাটতিঃ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সম্পর্ক (Democracy Deficit: Relation to Education and Economic Development)

“Healthy economy or education doesn’t necessarily bring pure Democracy but Democracy leads to both”

আমরা সবাই জানি আফ্রিকা মহাদেশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বলা হয়। এথনিক কনফ্লিক্ট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা, হাঙ্গামা আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই লেগে থাকে। এখনো পর্যন্ত আফ্রিকা মহাদেশে ২০ লক্ষ কিশোর সন্ত্রাসী রয়েছে যারা হাইলি আর্মড। গণতন্ত্রের স্রোতে গা ভাসিয়ে পৃথিবীর প্রায় ১২০ টির মত দেশই সেদিকে ধাবিত হয়েছে কিন্তু আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশেই গণতন্ত্র মুখ থোপড়ে পড়েছে বারবার নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান ও দীর্ঘদিন তাদের স্বৈরাচারী শাসনের কাছে।

“উন্নত শিক্ষা অথবা অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে শুদ্ধ গণতান্ত্রিক চর্চার কোন সম্পর্ক নেই তবে শুদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে উন্নত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিদ্যমান” আমরা মহাদেশিভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করলেই কথাটির সত্যতার প্রমাণ পাবো৷ আমি আফ্রিকাকে মুখ্য রেখে নিচে এর বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। আফ্রিকার শাসক ও গণতন্ত্রঃ আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই প্রেসিডেন্ট হলো সরকার প্রধান। পৃথিবীতে গণতন্ত্রের নামে আফ্রিকার দেশগুলোতে যে মেয়াদী ক্ষমতা দখল চলেছে/চলছে তাতে মনে হয় প্রেসিডেন্টরা একপ্রকার প্রতিযোগিতা করছেন কে কত বছর ডেমোক্রেসির নাম ভেঙে গদি না ছেড়ে থাকতে পারে।

Equatorial গিনি’তে Tedoro Obiang ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতা দখল করে আছেন, তিনিই ক্ষমতা দখলের দৌড়ে বর্তমানদের মধ্যে এখন পর্যন্ত শীর্ষে। সুদানের Omar al basir ১৯৯৩ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট, Chad এর Idris Deby ১৯৯০ সালে থেকে, Cameroon এর Paul Biya ১৯৮২ সাল থেকে এবং Angola এর J. Eduardo Santos ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় ছিলেন এবং ২০১৭ তে লরেঙ্ক কর্তৃক তার দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরাশাসনের ইতি ঘটে। Algeria এর Abdel Aziz ১৯৯৯ সাল থেকে এবং Democratic Republic of Congo এর Joseph Kabila ২০০১ থেকে ক্ষমতা দখল করে আছেন। আর জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবের কথা তো আমরা সবাই জানি যিনি তোপের মুখে গতবছর দুঃশাসনকে অব্যহতি দেন। এই যে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশগুলোতে গণতন্ত্রের ছত্রছায়ায় একক শাসন গড়ে উঠেছে তাতে গণতন্ত্র নিজেই সেখানে হাল ছেড়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেছে। গোত্রীয় দ্বন্দ্ব নিয়ে পড়ে থাকা মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি অনীহাও অনেকাংশে দায়ী। ঐ দেশগুলোতে রেগুলার ইলেকশন হয় ঠিকই কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বেশিরভাগ দেশেই রেজিস্টারড ভোটার সংখ্যা ৬০-৭০% শতাংশের বেশি নয় এমনকি সেখানকার অর্থনৈতিক জায়ান্ট দেশগুলোও এর ব্যতিক্রম নয় আবার নির্বাচনের সময় মাত্র ৩০-৪০% ভোট কাস্টিং(টার্নআউট) হয়।

আফ্রিকা দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিক্ষাঃ

এখন আসা যাক ঐ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও শিক্ষায়। পৃথিবীর যত উন্নয়ন সূচক, দুর্নীতি সুচক, ডেমোক্রেসি সূচক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সূচক করা হয় সেখানে দেখা যায় শেষের দিকের দেশগুলোর মধ্যে প্রায় সবই আফ্রিকার দেশ। ফ্রিডম হাউজের রিপোর্ট অনুযায়ী তিউনেশিয়া, বেনিন, সেনেগাল, সাউথ আফ্রিকা, সাওটোম এন্ড প্রিন্সিপে, ক্যাফ ভার্দে, মরিশাস, বতসোয়ানা, ইকোটোরিয়াল গিনি এই দেশগুলো “ফ্রি” যেখানে মানুষের Political Rights and Civil Liberties high. অথচ ইকোটোরিয়াল গিনির ওবিয়াং গণতন্ত্রের নামে একদলীয় সরকারব্যবস্থায় আজ ৩৯ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। অন্যদিকে তিউনেসিয়া “আরব স্প্রিং” এর মাধ্যমে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে ‘ফ্রি’ কান্ট্রির মধ্যে নিজের স্থান করে নিয়েছে।
অস্ট্রিয়া কর্তৃক ঘোষিত গণতান্ত্রিক দেশের র‍্যাংকিং এ সাউথ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, নামিবিয়া, মরিশাস ছাড়া অন্য দেশগুলোকে তালিকায় স্থানই দেয়া হয় নি। এছাড়াও যুক্তরাজ্যের ডেমোক্রেসি ইনডেক্স এ সাউথ আফ্রিকা, নামিবিয়া, বতসোয়ানা, সেনেগাল, মরিশাস, ক্যাফ ভার্দে, বেনিন এই দেশগুলো ছাড়া অন্যান্য দেশগুলোর অবস্থান ১০০ টি দেশের পরে।

অথচ আফ্রিকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশেগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক সূচকে ভাল অবস্থানে থাকা দেশগুলো ছাড়াও মিশর, আলজেরিয়া, ফেসোসহ আরো অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোও রয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো পিউর গণতান্ত্রিক চর্চায় সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশটির(ইকো. গিনি) জিডিপি সর্বোচ্চ। আবার গণতান্ত্রিক সূচক ভালো অবস্থানে না থাকা অনেক দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ।
অন্যদিক জিম্বাবুয়ে, কেনিয়ার মত দেশ! কসর্বোচ্চ শিক্ষার হার নিয়েও সেসব দেশে গণতন্ত্রিক চর্চায় ভূমিকা রাখরে পারছে না।
অর্থাৎ গণতন্ত্র খুব ভালভাবে সাস্টেইন করার জন্যে এর নির্ভেজাল চর্চা দরকার, শুধুমাত্র রেগুলার ইলেকশন ও ম্যাজোরিটি দিয়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতা দখল করে রাখা অবশ্যই গণতন্ত্রের ছত্রছায়ায় একনায়কতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বহন করে কারণ সেসব দেশগুলো প্রেস ফ্রিডম থাকে না, মানুষের অধিকার থাকে না, দুর্নীতি বেড়ে যায় অর্থাৎ যাকে বলা যায় “Control Democracy”

ফরিদ জাকারিয়া ১৯৯৭ সালে ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো সম্পর্কে যে “একদিন হয়তো এই দেশগুলোতেও গণতন্ত্রের উত্থান হবে কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরের অবস্থা বর্তমান অবস্থা থেকেও করুণ হবে”
বাস্তবিকতা কিন্তু তাই। ২০১১ সালে আরব স্প্রিং এর মাধ্যমে আফ্রিকা ও মধ্য প্রাচ্যের দু একটা দেশে গণতন্ত্র ফিরে এলেও অবস্থার উন্নতি হয় নি।

গণতন্ত্র ও বিশ্বের অন্যান্য দেশঃ গণতন্ত্র থাকা মানেই যে একটি দেশের Political Rights and Civil Liberties high হবে কিংবা শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে অথবা দুর্নীতি থাকবে না এমনটি কখনো নয় তবে এটাও সত্য প্রকৃত উদার গণতন্ত্রের চর্চা থাকলে এসব সমস্যার সৃষ্টি হবে না।
আমরা চীন আর রাশিয়ার কথা বলতে পারি, রাশিয়ায় পুতিন ২০০০-২০০৮ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন মাঝখানে ৪ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আবার ২০১২ থেকে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। আমি যদি দেশটির শিক্ষা ও অর্থনীতি ও মানব উন্নয়নের দিকে তাকাই তাহলে পুতিনের শাসনকে ব্যর্থ বলে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারি না কিন্তু ডেমোক্রেসি ইনডক্সের ১৬৭ টি দেশের মধ্যে রাশিয়ার অবস্থান ১৩৫ তম। আবার চীনে ডেমোক্রেসির ফ্লেভারে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে জনগণই শেষ কথা কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা, ইন্টারনেট এক্সেস, প্রেস ফ্রিডম নেই এবং ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে অবস্থান ১৩৯ তম। এ দুটি দেশের মাথাপিছু আয়, জিডিপি ভাল হলেও স্বচ্ছতা ও গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ।

অন্যদিকে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশই পৃথিবীর যে কোন সুচকে ভাল অবস্থানে থাকে বিশেষ করে নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, আইসল্যান্ড, ইটালি, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ। এই দেশগুলোর গণতন্ত্র যেমন শুদ্ধ তেমনি শিক্ষা, অর্থনীতি, মানুষের স্বাধীনতাও সর্বোচ্চ। এছাড়াও নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান এই দেশগুলোতেও গণতান্ত্রিক পিউর চর্চার পাশাপাশি মানব উন্নয়ন, শিক্ষা, মাথাপিছু আয়, রাজনৈতিক অধিকার সর্বোচ্চ পর্যায়ের।
এশিয়ার দেশ ইরান, আফগানিস্তান, লেবানন যাদের শুদ্ধ রাজনৈতিক চর্চা নেই, ফ্রিডম হাউজ ইনডেক্সে তালিকার শেষের দিকে অবস্থান কিন্তু মানব উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *