সপ্তংক নীতি(Saptanga Theory)
কৌটিল্য ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন শিক্ষক যিনি একাধারে শিক্ষক, দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, রাজকীয় উপদেষ্টা এবং আরো অনেক কিছু।তার সাহায্য এবং পরামর্শেই সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য অখণ্ড ভারত নিমার্ণে সক্ষম হন।তিনি ইতিহাসে চাণক্য, বিষ্ণুগুপ্ত হিসেবেও সমানভাবে পরিচিত।
তার বিখ্যাত গ্রন্থ “অর্থশাস্ত্র” যা ১২শতক পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে ব্যবহৃত হতো সেই গ্রন্থে তিনি তার রাজ্য পরিচালনার মূল নীতি “সপ্তংক নীতি” বর্ননা করেছেন।
তার মতে-
রাজ্যের উপাদান মোট ৭টি।
*রাজা হলেন সবকিছুর কেন্দ্রে।একজন শক্তিশালী রাজাই রাজ্য কে দৃঢ়তা দিতে পারেন। রাজার রাজকীয় বংশ পরিচয়ের সাথে বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতাও সমান ভাবে প্রয়োজন এবং একজন রাজাকে অবশ্যই অন্যান্য উপাদানগুলোর অপরিহার্যতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। রাজাকে নিজের সুখের উপরে তার জনগণ ও সেনাবাহিনীর সুখকে প্রাধান্য দিতে হবে।
চানক্যের মতে -“রাজা পদটি শুধুমাত্র একটি অধিকার বা সুবিধা না এটি একই সাথে একটি দায়িত্ব।”
*রাজ্যের ২য় উপাদান হলো অমাত্যবৃন্দ।তাদের বিবরণে তিনি বলেছেন- অমাত্য দের হতে হবে স্থানীয়, জ্ঞানী, নিজের কাজে পারদর্শী এবং অবশ্যই দূর্বল চিত্তের না।তারা রাজার প্রতি অনুগত থাকবে এবং রাজার উন্নতিতে সাহায্য করবে। তিনি আরো বলেন যে অমাত্যের সংখ্যা ন্যুনতম ৩ জন থাকা উচিত যাতে ২ জন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে ১জন যেন রাজার পক্ষে থাকেন।তদুপরি অমাত্যের উপর পুরোপুরি বিশ্বাস রাখা উচিত না এবং তাদের নিয়মিত নজরদারিতে রাখা উচিত। কারন তারাই রাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধনে সক্ষম।
*৩ নম্বরে উনি বলেছেন দূর্গের কথা। দূর্গ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে।যেমন: পানি,পাহাড়, মরুভূমি প্রভৃতি। কৌটিল্যের মতে – দূর্গ সমূহ রাজ্যের শক্তি প্রদর্শন করে এবং তা আক্রমণাত্মক নাকি রক্ষণাত্মক তাও প্রকাশ করে
*তারপরে আসে জনপদ। জনপদ হলো গ্রামীণ লোকালয় যেখানে সাধারণ মানুষের বাস।পরিচালনের সুবিধার জন্য তিনি জনপদকে কিছু ভাগে বিভক্ত করেছেন। যেমন:
-কিছু বিভাগ নিয়ে একটি জনপদ গঠিত। বিভাগীয় প্রধানের পদবী “স্থানিক”।
-কিছু গ্রাম নিয়ে একটি বিভাগ গঠিত, গ্রাম প্রধান হলেন “গ্রামিক”।
-কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত সংস্থার প্রধান হলেন “গোপ”
*পরবর্তী উপাদান হলো কোষ। কোষের মাধ্যমে রাজ্যের সকল অর্থনৈতিক কাজ সম্পাদন হয়। জনগণ হতে প্রাপ্ত কর কোষে জমা হয় যার মাধ্যমে দেশের সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে সকল উপাদান রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কোষ সরাসরি রাজার জিম্মায় থাকে। তিনি আরো বলেন কোষ এমন ভাবে পরিচালনা করা উচিত যেন তা যে কোন ধরনের দূর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম হয়
*রাজ্যের ৬ষ্ঠ উপাদান হলো দন্ড বা বল।
তার মতে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় থেকে সেনা নিয়োগ দেয়া উচিত। তদুপরি গুন পর্যালোচনায় অন্যান্য গোত্রের মানুষও সেনাবাহিনী তে যোগদানে সক্ষম।সেনাবাহিনী অবশ্যই নিয়মিত অনুশীলন এবং ভাতা দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
* সর্বশেষ উপাদান হলো মিত্র।রাজ্যের দৃঢ়তা এবং সামর্থ্য অবশ্যই তারা মিত্রের সংখ্যা দ্বারা অনুমান করা সম্ভব। তিনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সাথে সুসম্পর্ক-র উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আরো বলেছেন একজন আদর্শ মিত্র শুধু সেই নয় যে সাহায্য করতে আগ্রহী,একজন আদর্শ মিত্র সেই যার সাহায্যের ইচ্ছার পাশাপাশি উপযুক্ত সামর্থ্যও থাকে।
কৌটিল্যের এই নীতির উপর ভিত্তি করেই প্রাচীন ভারতের বহু সাম্রাজ্য পরিচালিত হয়েছে। এমনকি এই আধুনিক যুগেও এটি বহুল আলোচিত একটি নীতি।