Terms2Day

গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব (Democratic Peace Theory)

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ সাধারণত নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়ায় না এটাই গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব (Democratic Peace Theory) হিসেবে পরিচিত। ইমানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant) ১৭৯৫ সালে তার লিখিত গ্রন্থ “Perpetual Peace”-এ সর্বপ্রথম এই ধারনার প্রবর্তন করেন।

তার ধারনাটা ছিল,বেশিরভাগ রাষ্ট্রই যুদ্ধে জড়াবে না যদি সেগুলো গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র হয় কারন উদার গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা চর্চার মাধ্যমে কোন আগ্রাসী রাষ্ট্রের অস্তিত্বই থাকবে না এবং প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বজুড়ে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করবে।

গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্বকে ঘিরে বা কেন্দ্র করে মূলত ৩ টি তত্ত্ব (Theory) রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, মোনাডিক (Monadic) তত্ত্ব, এই তত্ত্ব অনুসারে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ অধিক শান্তিপূর্ণ এবং খুব সহজে যেকোনো ধরনের রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ বা সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ডায়াডিক (Dyadic) তত্ত্ব যা প্রায় সর্বজন স্বীকৃত, এই তত্ত্ব অনুসারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে যুদ্ধে না জড়ালেও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তৃতীয় অর্থাৎ সর্বশেষ তত্ত্বটি হচ্ছে, সিস্টেমিক (Systemic) তত্ত্ব। সিস্টেমিক তত্ত্ব অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা যত বেশি বৃদ্ধি পাবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তত বেশি শান্তিপূর্ণ হতে থাকবে।
আমরা জানি যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহে সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকে ফলে, তারা রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ,

যেকোনো যুদ্ধে জড়িত হয়ে রাষ্ট্র যদি পরাজিত হয় তবে সেই রাষ্ট্রের ক্ষমতায় সরকারের টিকে থাকা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই, যুদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সাধারণত উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ তাদের কূটনীতিকে শক্তিশালী করে তোলে।

এছাড়াও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ মুক্তবাজার অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, ফলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের উপর নির্ভরতা তৈরি হয় এবং এরা নিজ স্বার্থে হলেও কখনোই সহজে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে জড়ায় না।
বাস্তববাদীরা প্রায়ই গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্বকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে থাকে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা অস্থিরতায় ভরপুর অর্থাৎ বিশৃঙ্খল। যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব সবসময়ই বিরাজ করে, ফলে প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই উচিৎ যুদ্ধের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা। তারা আরও মনে করেন, কোন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অপর একটি বিরোধী গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাথে তেমনটাই আচরণ করবে যেমনটা সে তার বিরোধী অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের সাথে করে থাকে। কোন বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাই রাষ্ট্রকে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া থেকে প্রতিহত করতে পারে না। কারন ক্ষমতার অসম বণ্টন ও প্রতিযোগিতা যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। স্থায়ী শান্তি বলে কিছু নেই, স্থায়ী শান্তি একটা মিথ মাত্র, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ যে ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক থাকবে তারও কোন ভরসা নেই। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব তখনই সত্য বলে মনে হতো যখন সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জনমত যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধের বিপক্ষে থাকতো। তারা এটাও বিশ্বাস করে, গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন কোন বিশেষ উপাদানের অস্তিত্ব নেই যা রাষ্ট্রসমূহকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখতে পারে।
আমরা যদি আমাদের সমসাময়িক বিশ্বরাজনৈতিক অবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্ব অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকভাবে কাজ করছে না, ক্রমাগত বিতর্কিত হচ্ছে।

আমরা জানি, ইউ এস এ (USA) বিশ্বের সবচাইতে বড় উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিন্তু তারাই বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলমান বেশিরভাগ যুদ্ধ, সংঘর্ষ ও সংকটের জন্য দায়ী।

তারা সর্বদাই বিশ্বকে তাদের ক্ষমতার অপচর্চার মাধ্যমে প্রভাবিত করতে ব্যস্ত, মধ্যপ্রাচ্য সংকটও তাদেরই তৈরি, সিরিয়া যুদ্ধও প্রধানত তাদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। অপরদিকে, ইসরায়েলও (Israel) একটি বিশুদ্ধ গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া শর্তেও ফিলিস্তিনের সাথে যৌক্তিক কোন কারন ছাড়াই ক্রমাগত সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে। আর, এইসব কারনেই বর্তমান সমাজে গনতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বার বার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *