Explainer

থিওডর এডোর্নো এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল্যায়ন (Theodor Adorno & The Assessment Of The Capitalist System)

যুগে যুগে বিভিন্ন স্কুল অফ থট (School Of Thought) পুরো সমাজ তথা বিশ্বব্যবস্থাকেই পাল্টে দিয়েছে, “স্কুল অফ থট” হচ্ছে মূলত যেকোনো একটি ব্যাপারে কোনো একটি দল বা গ্রূপের পোষণ করা ধারণার সেট অথবা মতামত। আর তেমনই একটি বিখ্যাত সামাজিক গবেষণা ভিত্তিক ইনস্টিটিউট বা স্কুল অফ থট ছিল দ্যা ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল (The Frankfurt School), যা কিনা ফেলিক্স ওইল (Felix Weli) নামক এক ব্যক্তির সরাসরি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালীন জার্মানিতে। থিওডোর লুডভিগ উইসেনগ্রান্ড এডোর্নো (Theodor Ludwig Eisen Grund Adorno) (১৯০৩-১৯৬৯) ছিলেন ফেলিক্সের খুব ভাল একজন বন্ধু এবং সেই স্কুলেরই শীর্ষ এক চিন্তাবিদ। মি: এডোর্নো একই সাথে সমাজ, সংস্কৃতি, মনস্তত্ত্ব, নন্দন, সংগীত, দর্শনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক লেখা লিখে গিয়েছেন, যেগুলো সত্যিই অনেক প্রভাবশালী নানা মাপকাঠিতে। কিন্তু কোনো অদ্ভূত কারণে দেখা যায়, তাকে নিয়ে বর্তমান যুগে খুব একটা আলোচনা হয় না, এমনকি সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অধ্যনরত তরুণ-তরুণীদের কাছেও এই শক্তিশালী চিন্তাবিদের নামটি অপরিচিত থেকে যায়, আর তাই তো এই মহান প্রতিভাবান মানুষটাকে ক্ষুদ্র করে হলেও চেনানোর খাতিরে আজ লিখতে বসে গেলাম।

এডোর্নোর দর্শন গড়ে উঠেছিল মানুষের ভোগান্তিকে কেন্দ্র করে, তিনি স্বপ্ন দেখতেন ভোগান্তিহীন এক সুন্দর পৃথিবীর। তিনি তার পূর্ববর্তী ৩ জন মহান জার্মান দার্শনিকের কাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, সেই দার্শনিকরা হচ্ছেন যথাক্রমে হেগেল, মার্ক্স এবং নীৎশে।

ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল রিসার্চ বা ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সাথে সম্পৃক্ততাও তার চিন্তার জগৎকে কম প্রভাবিত করেনি। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের লক্ষ্য ছিল আধুনিক পুঁজিবাদ দ্বারা সৃষ্ট সমস্যা বিশেষ করে যে ধরনের সংস্কৃতি এবং মানসিকতা এর প্রভাবে তৈরি হয় তারই সূক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কিভাবে আমাদের দুর্নীতি ও সার্বিক অবনমনের দিকে নিয়ে যায় সেই সম্পর্কে এডোর্নোই সর্বপ্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং পরবর্তীতে তিনি এই ব্যাপারে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। প্রথমত, পুঁজিবাদের প্রভাবে আমাদের অবসর সময় কিভাবে বিষাক্ত হয়ে যায় সেই দিকটায় তিনি আলোকপাত করেন। মানুষের অবসর সময় কিসের জন্য ব্যবহার করা উচিৎ সেই সম্পর্কে এডোর্নোর খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল।

তার মতে অবসর সময় কোনোভাবেই আরামে বা চিন্তাভাবনা ছাড়া বসে থাকার জন্য নয় বরং এটাকে কাজে লাগাতে হবে এমন কোনো ক্ষেত্রে, যার ফলে ব্যক্তির সত্ত্বা পূর্বের তুলনায় বহুগুণে প্রসারিত বা উন্নত হবে ও সে সমাজ পরিবর্তনের উপাদান অর্জন করবে- যেটা প্রকৃত অর্থে গোটা সমাজ ব্যবস্থাটাকেই পাল্টে দিবে।

এডোর্নো বলেন, অবসর সময়ে আমরা এমন একটি ছবি দেখতে পারি যা আমাদের সম্পর্ককে নতুন ও পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করবে অথবা বই পড়তে পারি যা আমাদের একটি পরিষ্কার অন্তর্দৃষ্টি দিবে রাজনীতির ব্যাপারে অথবা গান শুনতে পারি যা  আমাদের সাহস দিবে নিজেদের সংস্কার ও সামষ্টিক জীবন ধারণের ক্ষেত্রে। কিন্তু এডোর্নোর অভিযোগটা ছিল,

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে এই ইস্যুগুলো সর্বত্র বিরাজমান এবং ভীষণ অমঙ্গলকারী একটি বিনোদন যন্ত্রের হাতে পড়েছে যাকে তিনি অভিহিত করেছেন সাংস্কৃতিক জগৎ বা কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি নামে।

এডোর্নোর মতে, আধুনিক চলচ্চিত্র, টিভি বা রেডিও অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া বলতে গেলে এমন ভাবেই তৈরি করা হয়েছে যা আমাদের নিজেদের থেকেই বিচ্ছিন্ন করে রাখে এবং আমরা এই চক্রে পড়ে নিজেরাই নিজেদের বুঝতে ব্যর্থ হই। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, টিভি বা রেডিওতে খবরগুলো আমাদের অশ্লীলতা ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাজানো রাজনৈতিক ঘটনা শোনায় যা আমাদের সত্যি ব্যাপারগুলোকে বোঝার সম্ভাবনা থেকেই দূরে ঠেলে দেয়। চলচ্চিত্রগুলো আমাদের পৃথিবীতে অবাস্তবিক ভিনগ্রহের প্রাণীর আক্রমণের রোমাঞ্চ দেখায় যেটা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের পৃথিবীতে বিদ্যমান সমস্ত বাস্তবিক বিপর্যয় বা দুর্যোগকে উপেক্ষা করে। অপরদিকে, তথাকথিত আধুনিক পপ সংগীত আমাদের শেখায় যে, ভালবাসাকে কেবল একজন বিশেষ মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব যা আমাদের সম্প্রদায় অর্থাৎ চারপাশের মানুষের থেকে ক্রমাগতভাবে বিচ্ছিন্ন করে। বর্তমান যুগে আমরা আমাদের জাদুঘর বা শিল্প প্রদর্শনীতে ঠিকই বিচরণ করি কিন্তু এটাই কখনোই জানার চেষ্টাও করি না আসলে এগুলোর অর্থটা কি অথবা কেনই বা এগুলোর প্রতি আমাদের যত্নবান হওয়া উচিৎ। সাংস্কৃতিক জগৎ বা কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি এভাবেই আমাদের বিচ্ছিন্ন, দ্বিধান্বিত ও কিছুটা ভয়ার্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে।

দ্বিতীয়ত, এডোর্নোর মতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদের কাছে এমন কিছু কখনোই বিক্রি করে না আমাদের আসলেই দরকার বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদিত পণ্যগুলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে কারো না কারো নিতে হবে বলেই সেগুলো আমাদের বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে কিনে নিতে একপ্রকার বাধ্য করা হয়।

আমরা মনে করি যে, প্রাচুর্যতায় ভরপুর এমন এক দুনিয়ায় আমাদের বসবাস যেখানে উন্নতি লাভের সব উপাদান অর্থাৎ আবেগপ্রবণতা, বোঝাপড়া, সূক্ষ্ণদৃষ্টি, শান্ত পরিবেশ ও সম্প্রদায় এই সবই আমাদের রয়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে বাস্তবতা হচ্ছে উল্লেখিত সবগুলিই আমাদের বর্তমান দুনিয়ার অর্থনীতিতে একপ্রকার দুষ্প্রাপ্য ও অনুপস্থিত উপাদান মাত্র।

যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদের কাছে কোনো কিছু বিক্রির চেষ্টা করে তখন শুরুতেই তাদের বিজ্ঞাপনে এমন কিছু দেখায় যা আমাদের আসলেই দরকার কিন্তু বিজ্ঞাপনের পরবর্তী অংশেই এমন কিছুর সাথে সংযোজন করা হয় যা আমাদের কোনোভাবেই প্রয়োজন নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বিজ্ঞাপনের শুরুতেই দেখায় অনেক বন্ধু মিলে সমুদ্র সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথবা একটি পরিবার হাস্যোজ্জ্বলভাবে বনভোজন করছে কোথাও। বিজ্ঞাপনদাতারা শুরুতেই আমাদের এমন জিনিস দেখান কারণ তারা এটা বেশ ভালভাবেই জানেন, আমরা সবসময়ই স্বভাবসুলভভাবে বন্ধুত্ব বা অন্য মানুষের সাথে যুক্ত হতে পছন্দ করি ও যুক্ত থাকতে চাই। কিন্তু শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সবসময়ই চায় আমাদের ভোগবাদী হিসাবে একা রাখতে। তাই, বিজ্ঞাপনের শেষটা হয় সবসময়ই এমন কিছু দিয়ে যা আমাদের কোনোভাবেই প্রত্যাশিত না যেমন: ২৫ বছরের একটা ছেলেকে হুইস্কি অথবা এমন উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন বিলাসী গাড়ি কিনতে প্রলুদ্ধ করা যা আসলে তার বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তার সাথে সম্পর্কযুক্তই নয়। এভাবেই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আমাদের আসল চাহিদাকে তাচ্ছিল্য করে।

এডোর্নো ফ্যাসিস্ট চিহ্নিত করার জন্য প্রশ্নমালা তৈরি করছিলেন, যেটাকে তিনি ও তার দল নাম দিয়েছিলেন এফ-স্কেল অর্থাৎ ফ্যাসিস্ট স্কেল। এফ-স্কেল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির সব স্কুলেই তিনি এবং তার দল পাঠিয়েছিলেন একটি বিশেষ পরীক্ষার উদ্দেশ্যে। এই পরীক্ষার ফলাফল হিসেবে যা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে, মানসিকতাই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এডোর্নোর মতে, কেউ জন্মগত ভাবেই বর্ণ বৈষম্যবাদী, স্বৈরাচার বা একনায়কতান্ত্রিক হয়ে জন্মায় না বরং সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ ও সমাজ থেকেই তারা এই অসুস্থ ও অপরিণত মানসিকতা বা মনোভাব অর্জন করেন।

একটি ভাল সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে, এমন অসুস্থ ও অপরিণত মনোভাবকে সমাজে চিহ্নিত করে তা নিরসনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা নয়তো এই ধরণের সমস্যা এমন পরিণতির দিকে যাবে যা পরবর্তীতে শক্তি প্রয়োগ ছাড়া কোনোভাবেই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না তাদের পক্ষে। সুতরাং আমাদের সবারই উচিৎ শুরুতেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের উগ্রতাকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে উৎসাহী হওয়া।

এডোর্নো মনে করতেন, আমাদের সামাজিক উন্নয়নের পথে সবচাইতে বড় বাধা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয় বরং তা হচ্ছে সাংস্কৃতিক বা মানসিক।

আমাদের ইতিমধ্যে টাকা, সম্পদ, সময় ও দক্ষতাসমূহ রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা এটা নিশ্চিত করতে পারি যে, সবাই বাড়িতে শান্তিতে ঘুমাবে ও জীবনধারণ করবে, কেউ কারো কোনো ক্ষতি করবে না, কেউ গাছপালা ধ্বংস করবে না, সমাজে সবার সাথে সবার সুসম্পর্ক স্থাপন হবে। কিন্তু এতকিছু থাকার পরও আমরা এখনো ভুগছি এবং একে-অপরের ক্ষতি করছি কারণ আমাদের মন-মানসিকতা এখনো অসুস্থ এবং দূষিত। যতদিন না এই মন-মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আসবে ততদিন পর্যন্ত সমাজ অসুস্থ ও সকলের জীবনধারণের জন্য অনুপযুক্ত হিসেবে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *