Terms2Day

বিপ্লব (Revolution)

বিপ্লব অথবা Revolution এর মতো অত্যধিক ব্যবহৃত এবং অপব্যবহৃত শব্দ রাজনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় খুব অল্পই রয়েছে। ১৯৫০ সালের থার্ড ওয়ার্ল্ডিজম (Third Worldism) এবং ১৯৬০ এর দিকের মুক্তি সংগ্রাম গুলো এই শব্দটির জনপ্রিয়তায় আরো বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। বিভিন্ন ভাবে এই দুই দশকের চীন, কিউবা এবং আফ্রিকা জুড়ে ঘটে চলা ঐতিহাসিক উন্নয়ন গুলো কার্যত বৈপ্লবিক। পুরাতন রাজনৈতিক পদ্ধতির (Political Order) বিনাশ ঘটেছে, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে নতুন পদ্ধতি, রাষ্ট্র এবং সমাজের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

কিন্তু যখন রাজনীতিবিদেরা নিজেদেরকে “বিপ্লবী” বলার দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ফায়েদাটা অনুভব করতে পারলেন, এই টার্মটির ব্যবহার আরও ব্যাপক শুরু হলো। বিশেষত তাদের উৎসাহী অনুরাগীদের সামনে।

এইসব রাজনীতিবিদেরা তাদের ভক্তদের এবং বহিঃবিশ্বকে যা ই বোঝাতে চান না কেন, আদতে বিপ্লব শুধুমাত্র বক্তৃতা দেয়ার থেকেও বেশি কিছু। আঙ্গুল নাড়ানো কিংবা প্রতিপক্ষের দিকে বজ্রমুষ্ঠি প্রদর্শনের থেকেও ব্যাপক। আবেগ অবশ্যই অন্যান্য পলিটিকাল ফর্মের মতোই বিপ্লবের ও একটি বড় অংশ। কার্যত আবেগ, চিত্রকল্প, প্রতিক এবং উপমা বিপ্লবের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু ঐতিহাসিক উন্নয়নের মতো- ব্যাপক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ যা কি না পরবর্তীতে সামাজিক, সংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক অঙ্গনেও বিস্তার লাভ করে- বিপ্লব তুলনামূলক ভাবে একটি দূর্লভ ঘটনা।

বিপ্লবে এমন সব উপাদানের সমন্বয় দরকার হয় যা স্বাভাবিক অবস্থায় অর্জন করা সম্ভব নয়। যেমন- (১) লক্ষ মানুষের সমাবেশ, যাদের কাছে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমের থেকে জরুরী হয়ে পড়ে । (২)  রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পতন এবং সেই যায়গায় নতুনগুলোর প্রতিস্থাপন। (৩) এবং পলিটিকাল অর্ডারের পুনর্গঠন, যা কিনা তার পূর্বের টি থেকে আমূল ব্যাতিক্রমি। এই সকল পরিবর্তন শুধুমাত্র দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়বলিতে ই নয় একই সাথে আঞ্চলি এবং বৈশ্বিক ভাবেও একটি কম্পন ফেলে। সাথে সাথে এটি শক্তি ভারসাম্যে (Balance of Power), মিত্রদের মাঝে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে।

আমরা এবার বিপ্লবের কনসেপচুয়াল আলোচনায় প্রবেশ করছি। মেহরান কামারাভা বিপ্লবের (revolution) সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে-

“ As a phenomenon, a revolution entails a fundamental change in the institutions, and overall nature of the state and its relations with society.”

অর্থাৎ, রেভোলিউশন বা বিপ্লব রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান সমূহের মাঝে মৌলিক কিছু পরিবর্তন ঘটায় এবং সর্বপোরি রাষ্ট্রের প্রকৃতি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্কে পরিবর্তন আনয়ন করে।

যে কারণে বিপ্লব রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অন্যান্য ফর্ম যেমন “ক্যু” (Coup)  থেকে ব্যাপক রূপান্তরশীল (Transformative)। ক্যু বেশির ভাগ সময় ই মূলত শুধুমাত্র রাষ্ট্রের সরকারের পরিবর্তন এবং সেই সরকারের পলিসিতে পরিবর্তন আনে। রাষ্ট্রের ধরন এবং গঠন একই রয়ে যায়। অন্যদিকে বিপ্লব সেই রাষ্ট্রের গঠনগত কিছু পরিবর্তন, রাষ্ট্র পরিচালনা সহ মৌলিক বিধান গুলোতেও রদবদল করে।

বৃহত্তর পর্যায়ে বিপ্লবকে চারটি প্রকারে চিহ্নিত করা সম্ভব- পরিকল্পিত (Planned), স্বতঃস্ফুর্ত (spontaneous), সমঝোতার (negotiated), এবং উপর থেকে প্ররোচিত (instigated from above)

বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে,

(ক) পরিকল্পিত বিপ্লব (Planned Revolution): 

পরিকল্পিত বিপ্লব বলা হয় সেই বিপ্লবগুলোকে যা পূর্বপরিকল্পিত থাকে এবং পরবর্তীতে একদল স্বঘোষিত “বিপ্লবী”র মাধ্যমে গঠিত হওয়া গেরিলা বাহিনী দ্বারা রক্তাক্ত সংঘাতের সৃষ্টি করে। এবং যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থাকে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল।

চাইনিজ এবং কিউবান বিপ্লব এই ধরণের বিপ্লবের আদর্শ উদাহরণ। তাছাড়াও আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম এবং নিকারাগুয়ার বিপ্লব পুর্বপরিকল্পিত ছিলো।

(খ) স্বতঃস্ফুর্ত বিপ্লব ( Spontaneous Revolution): 

স্বতঃস্ফুর্ত বিপ্লবের পূর্বপরিকল্পনা থাকে না বললেই চলে। এইসব বিপ্লব মূলত আকস্মিকভাবে এবং বিশৃঙ্খল প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠে। এবং প্রাথমিক বিক্ষোভ এবং প্রতিবাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্রমাগত দূর্বল হওয়া থেকে উৎসাহিত হয়। বিদ্রোহীরা শীঘ্রই একটি চূড়ান্ত বিপ্লবের মাঝে এসব  প্রাথমিক প্রতিবাদী অনুভুতিকে কনভার্ট করে ফেলে। এবং এই প্রক্রিয়ার মাঝে প্রতিবাদী আন্দোলন আরো বেশি র‍্যাডিকাল এবং সহিংস হয়ে উঠে। প্রতিবাদী জনতার মাঝে নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করে। এবং এক পর্যায়ে জনসাধারণের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব গড়ে উঠে। যারা এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন।

এরকম বিপ্লবের উৎকৃষ্ট উদাহরহণ হলো, ফরাসি এবং ইরান বিপ্লব।

(গ) সমঝোতাপূর্ণ বিপ্লব (Negotiated Revolution):

যখন রাষ্ট্র দূর্বল হয়ে পড়ে এবং সমাজের (জনগণের) যেকোন দাবি মেনে নেয়ার মতো অবস্থায় চলে যায়। কিন্তু রাষ্ট্র পতনের মতো এতোটাও দুর্বল নয়। এবং একইসাথে যখন সমাজ রাজনৈতিকভাবে বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের থেকেও বেশি শক্তিশালি হয়ে যায় কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মতো অতোটাও নয়, তখনই মূলত সমোঝোতাপূর্ণ বিপ্লব ঘটতে দেখা যায়। এমতাবস্থায় একমাত্র সলিউশন খোলা থাকে রাষ্ট্রনেতা এবং সমাজের (জনগণের) মাঝে একটি সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের।

যেরকমটা আমরা দেখতে পাই ১৯৮০ এর দিকে পূর্বইউরোপের দেশগুলোতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যখন জনগণ এবং রাষ্ট্রনেতাদের সমঝোতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ট্রান্সফর্ম হতে শুরু করে।

(ঘ)  উপর থেকে প্ররোচিত বিপ্লব (Instigated from above) : 

সবশেষে, কিছু বিপ্লব আসে উপর দিক থেকে। যেমন- যারা রাষ্ট্র ক্ষমতার নতুন উত্তরাধিকার, তাদের দ্বারা প্ররোচিত। যারা সাধারণত সাবেক আর্মি কমান্ডার হয়ে থাকেন , বেশির ভাগ সময় তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরোক্ষভাবে দখল করেই রাখেন। কিন্তু তাদের এই ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যে সমাজকে (জনগণকে) তাদের নিজেদের ছাঁচে গড়ে নিতে চান। এই লক্ষ্যে তারা এক বা একাধিক জাতীয় সংকট অথবা নতুন দর্শনের সৃষ্টি করেন এবং সে লক্ষ্যে সাপোর্ট বেজ তৈরি করে বিপ্লবের আয়োজন করেন।

তুরষ্কের কামাল আতাতুর্ক, মিশরের গামাল আব্দুল নাসের এবং লিবিয়ার গাদ্দাফি এরকম বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব বিপ্লব সাধারণত অন্যান্য ধরণের বিপ্লবের থেকে অল্পস্থায়ী হয়। কেননা এগুলো সমাজের স্পন্দন থেকে সৃষ্ট না হয়ে বরং রাষ্ট্রনেতার দ্বারা নির্দেশিত ও পরিচালিত হয়।

বিপ্লব পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে রয়েছে। কিছু কিছু বিপ্লব পৃথিবীর ইতিহাসের গতি পথকে ই পালটে দিয়েছে। বিপ্লব চিরকাল পরিবর্তন, উন্নয়নের আশা দেখায়- কিছু কিছু সফল হয়। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে ব্যর্থ বিপ্লবের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

তথ্যসুত্রঃ

  1. Mehran Kamrava, (1992) “Revolutionary Politics”, Westport CT: Pareger
  2. George Thomas Kurian edited, (2011) “The Encyclopedia of Political Science”, CQ press, A division of Sage, Washington D.C

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *