স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন (Swami Vivekananda`s Philosophy On Education)
স্বামী বিবেকানন্দের আসল নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত, ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রিয়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের অন্যতম প্রধান শিষ্য। কেউ কেউ আবার দেবতা জ্ঞান করে এই মানুষটিকে সাধারণের থেকে আলাদা করে মন্দিরের লোক বলে প্রচার করেন। কিন্তু বিবেকানন্দকে শিক্ষাবিদ হিসেবে কেউ বোধহয় খুব একটা ভাবেন না। অথচ তাঁর শিক্ষাদর্শন অনেক বড় বড় শিক্ষাবিদের চিন্তার ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। তিনি দেড়শো বছর আগে যা ভেবেছেন, অনেক শিক্ষাবিদ তা এখন বলছেন এবং নিজের বলে দাবি করছেন। স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষাকে সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তার মতে, শিক্ষা হচ্ছে মানুষের মধ্যে যে পরিপূর্ণতা ইতিমধ্যেই আছে তারই বাস্তবায়ন। এখানে পরিপূর্ণতা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন মানুষের সক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাকে যা তাদের মধ্যেই বাস করে এবং বাস্তবায়ন বলতে বুঝিয়েছেন সেগুলোকে বিভিন্নভাবে টেনে অথবা খুঁজে বের করা হিসেবে। বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী, জ্ঞান যেহেতু আমাদের মাঝেই বাস করে সেহেতু সেই বসত করা জ্ঞানকে বের করে আনার দায়িত্ব আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। শিক্ষার এই অতি-ধারণা (super-concept) জনসাধারণ যাতে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারে তাই তিনি শিক্ষার একটি সংজ্ঞাই নির্দেশ করেন,
যে অনুশীলন দ্বারা ইচ্ছাশক্তির প্রবাহ ও অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রনের অধীন আসে এবং ফলপ্রসূ হয় তাকেই বলা হয় শিক্ষা।
সুতরাং, আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানার্জন যেভাবে চলছে তার সাথে স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাভাবনার স্পষ্টত বেশ বড় ধরনের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
যদি আমরা আমাদের বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গভীর দৃষ্টি দেই তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে একটি করুন বা বেহাল অবস্থার দেখা পাবো কারন আমরা আমাদের বাচ্চাদের স্বাধীনভাবে জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়াতে সম্মতি না দিয়ে উল্টো একপ্রকার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা একটা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্যের চাক ভেঙ্গে গিলে খাওয়াচ্ছি মাত্র, আর মনে মনে কেবল ভাবছি তারা ঠিক যতটুকু তথ্য হজম করতে অর্থাৎ স্মৃতিতে বা মনে রাখতে সক্ষম, তারা ঠিক ততটুকুই মেধাবী হিসেবে সমাজে স্বীকৃতি অর্জন করবে। বিবেকানন্দ বলেছেন,
তথ্য সংগ্রহ করাই যদি জ্ঞান হয়, তাহলে লাইব্রেরির থেকে জ্ঞানী তো আর কেউ নেই।”
স্বামী বিবেকানন্দ সর্বদা ঠিক এভাবেই জীবনমুখী শিক্ষার কথা বলে গিয়েছেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই তার দেখানো পথে আগায়নি বরং তার ভাবনার বিপরীতেই ক্রমান্বয়ে ধাবিত হচ্ছে। অনেকগুলো বই মুখস্ত করে পাশের পর পাশ দিয়ে চাকরি জোটাবার শিক্ষার দিকে হাঁটছি সবাই। কেরানি তৈরির যে শিক্ষাকে স্বামীজী কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন, তারই আদলে চলছে নতুন ধারার শিক্ষা।
বিবেকানন্দের জন্মের বেশ আগে পশ্চিমা শিক্ষাভাবনায় ‘Blank slate’ বলে একটি কথা খুব প্রচলিত ছিলো। John Locke নামক একজন পশ্চিমা চিন্তাবিদ একথা বলে খুব জনপ্রিয় হলেন। অনেকে শুনলেনও তার কথা। তার মানে শিশু খালি মাথা নিয়ে জন্মায় আর দিনে দিনে নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শেখে। শিশু অনেক শক্তি আর সামর্থ্য নিয়েই জন্মায় প্রকারান্তরে তিনি তা অস্বীকার করলেন। তার এ ভাবনা বিবেকানন্দের কথায় উড়ে যায় যখন তিনি শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন,
Education is the manifestation of the perfection already in man”
তার মানে, শিশুর শক্তি-সামর্থ্য জন্মগতভাবেই পাওয়া আর আমাদের কাজ হলো তার বিকাশ সাধনে কাজ করা। এতটুকু অনুধাবন করতে পারলে কোন কৌশলে তা করা যায় তার একটি পথ ঠিকই বের করা যায়। অথচ বিবেকানন্দের কথা অনেকেই শুনলেন না, যারা শুনলেন তাদের খুব কমই তা কাজে লাগাতে পেরেছেন। বহু পশ্চিমা পণ্ডিত বিবেকানন্দের সাথে একই সুরে কথা বলেছেন। এখন আমরা শুনছি শিক্ষায় মানুষের innate ability-এর কথা (Noam Chomsky)। বর্তমান শিক্ষাভাবনা এ দর্শনের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে বলা যায়। স্বামীজী বলেছেন, শিক্ষাকে সফল করার জন্য কয়েকটি গুণ বিশেষ সহায়ক, সে বিষয়সমূহে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই সজাগ থাকা একান্ত প্রয়োজন—শ্রদ্ধা বা আত্মবিশ্বাস, একাগ্রতা, ইচ্ছাশক্তির বর্ধন এবং ব্রহ্মচর্যনিষ্ঠা।
প্রথমত, শ্রদ্ধা বা আত্মবিশ্বাস। “নিজের প্রতি শ্রদ্ধা জাগলে যেমন হৃদয়ে মহাতেজের বিকাশ হয়, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনেও তেমনি তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস জেগে উঠে, প্রাণোচ্ছল হয়ে মহাবীর্যবান হয়ে সে মাথা তুলে দাঁড়ায়। সে জন্য ‘ইহার দ্বারা কিছু হইবে না’, ‘ও একেবারে অপদার্থ’—এই জাতীয় কথাগুলি উচ্চারণও করতে নেই; সশ্রদ্ধভাবে অপরকে নিজশক্তিতে বিশ্বাসী হতে বলতে হয়, মানুষ যে ইচ্ছা করলে সবকিছুই করতে পারে, এই সত্যটি শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দিতে হয়। শিক্ষাকে সফল করবার মহামন্ত্র এটি।”
দ্বিতীয়ত, একাগ্রতা। ‘মন যত একাগ্র হয়, ততই অল্প সময়ে ও অল্প পরিশ্রমে বিদ্যা আয়ত্ত হয়; শক্তি ও সময়ের অপচয় কম হয়।’
তৃতীয়ত, ইচ্ছাশক্তি। “পুনঃ পুনঃ ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ করিলেই জীবনের ঊর্ধ্বায়ন ঘটে। ইচ্ছাশক্তির প্রভাব অপরিসীম।” ‘চেষ্টা করলে পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের দ্বারা ইচ্ছাশক্তিকে বাড়িয়ে তোলা যায়। মন যখনই বিপথে চলতে চাইবে, তখনই জোর করে তাকে টেনে রাখতে হয়। ছোটখাট ঘটনাকে উপেক্ষা না করে তা করতে হয়। যতবার এরূপ করা যায়, ততবারই আত্মবিশ্বাস পূর্বাপেক্ষা বেড়ে যায়, ইচ্ছাশক্তি ততই সবলতর হয়। চরিত্র-গঠনের ইহাই একমাত্র উপায়—পুনঃ পুনঃ অভ্যাস। হাজার বার অকৃতকার্য হলেও চেষ্টা ছাড়তে নেই, উদ্যম হারাতে নেই; তা হলে সফলতা আসবেই আসবে। নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টার নামই মনুষ্যত্বের সাধনা।’
চতুর্থত, ব্রহ্মচর্য। স্বামীজী বলেছেন, “প্রত্যেক বালককে পূর্ণ ব্রহ্মচর্য পালন করিতে শিক্ষা দেওয়া উচিত; তবেই তাহার অন্তরের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস জাগ্রত হইবে। পূর্ণ ব্রহ্মচর্যের অর্থ চিন্তায়, বাক্যে ও কর্মে সর্বদা সর্বাবস্থায় শুচিতা রক্ষা করা।” ব্রহ্মচর্য পালন জ্ঞান আহরণের জন্য অত্যাবশ্যক। এর অভাবে আধ্যাত্মিক ভাব, চরিত্রবল ও মানসিক তেজ—সবই চলে যায়।
স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন ও শিক্ষাবিষয়ক যাবতীয় চিন্তারাশি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এসবের মধ্যমণি ‘মানুষ’। আর মানুষের সমস্ত দুর্দশার মূলে শিক্ষার অভাবকেই তিনি দেখতে পেয়েছেন। শিক্ষার অভাবেই সাধারণ মানুষ নিজের উন্নতির পথ বুঝতে পারে না। নিজের ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব ভুলে যায়। এর ফলে নিম্নমানের জীবনযাত্রা, একতা ও উচ্চ আদর্শের প্রতি উদাসীনতা ইত্যাদি তাদের সহজেই এসে পড়ে। জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারই সমস্ত উন্নতির মূল। এ শিক্ষা পরীক্ষা-পাসের জন্য যান্ত্রিক শিক্ষা নয়, মানুষের ভিতরে যে অপার সম্ভাবনা আছে, অনন্ত শক্তি আছে সে সম্বন্ধে বিশ্বাস জাগানোর শিক্ষা, নিজের পায়ে দাঁড়াবার শিক্ষা, নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরে পাবার শিক্ষা। শিক্ষাই হোক উন্নয়নের মূল হাতিয়ার। সে উন্নয়ন হোক ভেতরে ও বাইরে। বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে হোক আমাদের আত্মিক ও আর্থিক উন্নয়ন। আর বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন ছাতার মতো আগলে রাখুক সেই উন্নয়নের ধারা। আমাদের অন্তর্নিহিত পূর্ণত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করুক এই হোক আজ আমাদের প্রত্যাশা।