হাইব্রিড রেজিম (Hybrid Regime)
বর্তমান সময়ে রেজিম (Regime) শব্দটা আমরা প্রায় সবাই কমবেশি শুনতে পাই বিভিন্ন মাধ্যমে, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই শব্দটির ব্যাবহার ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা অনেকেই হয়তো এখনো এই শব্দটার প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থই জানি না সঠিকভাবে এবং যার ফলশ্রুতিতে আমরা প্রায়শই বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই বিশ্বরাজনীতির অনেক বিষয়কে ভালভাবে বুঝতে গিয়ে, তাই আজ শুরুতেই রেজিম (Regime) নিয়ে যাবতীয় ভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করবো এবং পরবর্তীতে সময়ের সাথে সাথে পুরো বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা “হাইব্রিড রেজিম (Hybrid Regime)”-এর ধারণাটাকে খুবই সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ করবো।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে,
রেজিম হচ্ছে সাধারণত শাসন বা শাসনব্যবস্থা অর্থাৎ কোনো একটি দেশের সরকার ও সেই সরকারের প্রবর্তিত সার্বিক ব্যবস্থাকেই রেজিম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
রেজিম বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে, রেজিম প্রধানত ৩ ধরনের :প্রথমত গণতান্ত্রিক (Democratic), দ্বিতীয়ত অগণতান্ত্রিক (Non-Democratic) এবং সবশেষে মিশ্র বা দোআঁশলা (Hybrid) রেজিম।
আমাদের আজকের মূল আলোচনাটা যেহেতু হাইব্রিড রেজিম (Hybrid Regime)-কে কেন্দ্র করে হওয়ার কথা তাই বাকি দুটো রেজিম নিয়ে আলোচনা খুব বেশি দীর্ঘায়িত করবো না, তবুও হাইব্রিড রেজিম ব্যাখ্যা করার স্বার্থেই এই দুই রেজিমের শুধুমাত্র সাধারন ধারণাটুকু দেওয়ার চেষ্টা করবো। তো প্রথমেই শুরু করা যাক গণতান্ত্রিক বা ডেমোক্র্যাটিক রেজিমের ধারণা দিয়ে, গণতান্ত্রিক বা ডেমোক্র্যাটিক রেজিম হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে গণতান্ত্রিক উপাদানসমূহ বিদ্যমান থাকে অর্থাৎ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, সকলের সম ভোটের অধিকার, রাজনৈতিক ও বেসামরিক অধিকারসমুহ যেমনঃ স্বাধীনভাবে যেকোনো ক্ষেত্রে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি। সুতরাং, গণতান্ত্রিক বা ডেমোক্র্যাটিক রেজিম হচ্ছে কোনো না কোনোভাবে সাধারন মানুষদের অংশগ্রহণমূলক একটি শাসনব্যবস্থা। অপরদিকে, অগণতান্ত্রিক বা নন-ডেমোক্র্যাটিক রেজিম হচ্ছে সম্পূর্ণভাবেই গণতান্ত্রিক বা ডেমোক্র্যাটিক রেজিমের বিপরীত একটি ব্যবস্থা অর্থাৎ এই ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক উপাদানসমূহ অনেকাংশেই অনুপস্থিত থাকে, নিয়মিত বিরতিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বিরতিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সাধারন মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ ক্ষুণ্ণ হয়, কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তি অথবা সরকার দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।
যাইহোক, এবার তবে ফিরে আসা যাক আমাদের মূল আলোচনার বিষয় হাইব্রিড রেজিমে। অনেকেই হয়তো শুরুতেই এখন ভেবে বসে আছেন ডেমোক্র্যাটিক আর নন-ডেমোক্র্যাটিক রেজিম তো বুঝলাম খুব সহজেই কিন্তু হাইব্রিড রেজিম! সেটা আবার কি?
“হাইব্রিড রেজিম (Hybrid Regime)” টার্মটার মাঝেই এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে। “হাইব্রিড রেজিম” এই টার্মটাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা প্রধানত দুইটি শব্দ পাই, শব্দ দুটি হচ্ছে যথাক্রমে “হাইব্রিড (Hybrid)” আর “রেজিম (Regime)।” হাইব্রিড শব্দের অর্থ হচ্ছে মিশ্র বা দোআঁশলা অর্থাৎ কোনো ক্ষেত্রে একই সাথে ভিন্ন প্রকৃতির একাধিক উপাদানের সংমিশ্রণ আর রেজিম শব্দের অর্থ তো লেখার শুরুতেই বলেছি শাসনব্যবস্থা। এই দুটি অর্থকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, হাইব্রিড রেজিম মানে একটি মিশ্র বা দোআঁশলা শাসনব্যবস্থা।
সুতরাং, হাইব্রিড রেজিম হচ্ছে এমন একটি মিশ্র বা দোআঁশলা শাসনব্যবস্থা যেখানে একই সাথে ভিন্ন দুই বৈশিষ্ট্যের রেজিম অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটিক ও নন-ডেমোক্র্যাটিক রেজিম সহবস্থান করে, আর এই কারনেই এই ধরনের রেজিমকে শুধুমাত্র ডেমোক্র্যাটিক অথবা নন-ডেমোক্রেটিক রেজিম হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না কোনোভাবেই।
হাইব্রিড রেজিমের কিছু কিছু দিক দেখতে গণতান্ত্রিক কিন্তু আচরনে অগণতান্ত্রিক, হাইব্রিড রেজিমে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন করতে চায় কিন্তু এমনভাবে নির্বাচন করে যেন শুধু তারাই বিজয়ী হয় এবং এইজন্য তারা শুধুমাত্র তাদের পছন্দ অনুযায়ী কোনো একটি দলকে নামমাত্র স্বাধীনতায় রাজনীতি করার সুযোগ দেয় যেন তাদের সমর্থন ও বৈধতা অব্যাহত থাকে, তাদের ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য তারা অনেক সময় স্বাধীন বিচারব্যবস্থার উপরও নানাভাবে প্রভাব খাটায় যার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা সর্বদা একটি শ্রেণীর নিকট কেন্দ্রীভূত থাকে। ঠাণ্ডাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ৯০ দশকের শুরুতে হাইব্রিড রেজিমের উত্থানের সূত্রপাত হয়। আমরা জানি, হান্টিংটং (Huntington) প্রদত্ত ডেমোক্রেসির থার্ড ওয়েভের (The Third Wave Of Democracy) মাধ্যমে বহু রাষ্ট্রই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় কিন্তু অনেক রাষ্ট্রই তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্য পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত ছিল না এবং যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে সেই রাষ্ট্রগুলোতে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র কখনোই প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকৃত হতে হতে ভিন্ন একটি রুপ পায় বিশেষ করে তৎকালীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে আর সেই বিকৃত রুপ বা ব্যবস্থাই হাইব্রিড রেজিম হিসেবে পরিচিতি পায়।
হাইব্রিড রেজিমকে প্রতিযোগিতামূলক স্বৈরাচার (Competitive Authoritarianism) অথবা অনুদার গণতান্ত্রিক (Illiberal Democracy) ব্যবস্থা নামেও আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৯৭ সালে নিউজ উইক ইন্টারন্যাশনাল ও ফরেইন অ্যাফেয়ার্সের ম্যানেজিং এডিটর ফরিদ জাকারিয়া (Fareed Zakaria), “The Rise Of Illiberal Democracy” শিরোনামে তারই প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে সর্বপ্রথম ইলিবারাল ডেমোক্রেসি সম্পর্কে ধারণা দেন এবং পরবর্তীতে ২০০৩ সালের শুরুতে “The Future of Freedom: Illiberal Democracy at Home and Abroad” শিরোনামে একই বিষয়ের উপর একটি বই লিখেন ও প্রকাশ করেন, তার লিখিত সেই আর্টিকেল ও বই পুরো বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে আমেরিকার সমসাময়িক বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যার লেরি জ্যা ডায়ামণ্ড (Larry Jay Diamond) “The Johns Hopkins University” থেকে প্রকাশিত “Journal Of Democracy”-তে “Thinking About Hybrid Regimes” শিরোনামে একটি আর্টিকেল লিখেন। আর এভাবেই বিশ্বব্যাপী হাইব্রিড রেজিম নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সূত্রপাত হয় যা এখন অবধি অব্যাহত আছে।
বিভিন্ন কারনে পুরো বিশ্বে হাইব্রিড রেজিমের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, প্রতিবছর প্রকাশিত ডেমোক্রেসি ইনডেক্সের (Democracy Index) দিকে নজর দিলে এই ব্যাপারটা বেশ ভালভাবেই অনুধাবন করা যায়।
বর্তমানে রাশিয়াকে (Russia) হাইব্রিড রেজিমের সবচাইতে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। হাইব্রিড রেজিমের এই ক্রমবৃদ্ধি ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা (Francis Fukuyama) প্রদত্ত উদার গণতন্ত্রের পক্ষে “The End Of History”-এর মতো যুক্তিতে ভরপুর শক্তিশালী ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে অর্থাৎ বর্তমানে পুরো বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র এক তীব্র সংকটকাল অতিক্রম করছে, গণতন্ত্রের মতো মৌলিক ব্যবস্থার সাথে হাইব্রিড রেজিমের মতো মিশ্র একটি ব্যবস্থার সংঘাতে শেষপর্যন্ত কোনটি টিকে থাকবে সেটি সময়ই বলে দিবে।