Explainer

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডঃ উদ্যান থেকে মৃত্যুপুরী

২৩ জুন, ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ যে বাঙালি তথা উপমহাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ অন্যান্য সব ক্ষেত্রে কতশত অনাকাঙ্খিত বেদনাবিধুর ঘটনার জন্ম দিয়েছিল তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড তার মধ্যে মর্মান্তিক একটি ঘটনা। এই গণহত্যার পিছনে অনেকগুলো কারণ ছিল এবং এই ঘটনার ভয়াবহতাও ছিল ব্যাপক।

পটভূমিঃ ১৯১৪-১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধ মূলত ছিল অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তির মধ্যে। ব্রিটিশরা ছিল মিত্রশক্তির অন্তর্গত। অনেক দেন-দরবারের পরে ভারতীয়রা ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর থেকে নানা কারণে সেনাবাহিনীতে পাঞ্জাবিদের অর্ন্তভূক্তি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। পাঞ্জাবিরা ছিল অন্যান্য প্রদেশের সৈন্যদের চেয়ে অত্যধিক সাহসী, অনুগত এবং সামর্থ্যের অধিকারী।

তাই তাদের যুদ্ধের ময়দানে জোর করেই প্রবেশ করানো হয়। আর ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে দেশে কৃষক-শ্রমিক শ্রেণীর তীব্র সংকট দৃশ্যমান হয়। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় দ্রব্যমূল্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যাভাব দেখা দেয়।

এতে সাধারণ জনগণ সরকারের উপর যথেষ্ট নাখোশ হয়। সমসাময়িক সময়ে “রাওলাট আইন” পাশ হয় যার ফলে বিনা বিচারে যে কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে রাখার বৈধতা প্রদান করা হয়। রুদ্ধদ্বার আদালতে বিচারকার্য সম্পাদন করা হত এবং এর বিরুদ্ধে আপীল করার সুযোগ ছিল না। একই সাথে সরকার বিরোধী দুই নেতা ড. সত্যপাল ও ড. কিউলিচকে নির্বাসিত করা হয়।

হত্যাকাণ্ডঃ পাঞ্জাবের আকাশে বাতাসে যখন বিদ্রোহের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে ঠিক সেই সময় ১৯১৯ সালের ১২ এপ্রিল, জেনারেল ডায়ারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হল। ক্ষমতা পেয়েই তিনি অমৃতসরে সকল প্রকার মিছিল-মিটিং এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।

কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষগুলো কেন মানবে সে নিষেধাজ্ঞা? তারা বাঁচার দাবিতে ১৩ এপ্রিলে জড়ো হয় সাজানো গোছানো উদ্যান জালিয়ানওয়ালাবাগে। জালিয়ানওয়ালাবাগ মূলত একটি উদ্যান এবং এর চারদিক মাটির দেয়াল ও ঘরবাড়ি দ্বারা আবদ্ধ ছিল। সেদিনের সে সমাবেশে প্রায় দশ হাজার সাধারণ মানুষের জমায়েত হয়েছিল।

এই খবর জেনারেল ডায়ারের কানে পৌছানো মাত্রই তিনি তার শক্তিশালী গুর্খা রেজিমেন্টের প্রায় ৫০ জন সদস্য নিয়ে উদ্যানের প্রবেশমুখে হাজির হন (অনেকের মতে সৈন্য সংখ্যা ১০০ বা তার বেশি ছিল)। তিনি যখন উপস্থিত হন তখনে সেখানে একজন নেতা ভাষণ দিচ্ছিলেন। রাগের বশে তিনি তখন তার রেজিমেন্টের সৈন্যদের গুলি বর্ষণের আদেশ দেন।

সৈন্যরা যত্রতত্র খই ফোটালো টানা ১০ মিনিট। গুলির মুখে উপস্থিত জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে উদ্যানের এদিক-ওদিক অর্থহীন ছুটাছুটি শুরু করল। উদ্যানের চারদিকে দেয়াল থাকার কারণে কেউ বের হতে পারল না সীমিত গণ্ডির ভিতর থেকে। সর্বমোট ১৬৫০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ হয়েছিল এবং সরকারি হিসেব বলে ৩৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাহলে প্রকৃত মৃতদেহের সংখ্যা কত হতে পারে তা পাঠকের অনুমানের উপর ছেড়ে দেওয়া হল। যে জালিয়ানওয়ালাবাগকে মানুষ পরিপাটি উদ্যান হিসেবে চিনত, তাঁকেই এখন ভয়ংকর মৃত্যুপুরী বানিয়ে দিল কয়েক মিনিটের ব্যবধানে।

পরবর্তীতে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আরো বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্ম দেয়। জেনারেল এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কথিত আছে, স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী প্রায় এক মাস পরে এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জানতে পারেন। কিন্তু অমৃতবাসীদের দুধের শিশুও জানত এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত।

এতে অমৃতসরবাসী দমে না গিয়ে রেললাইন উপড়ে ফেলে, টেলিগ্রাফ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। এতে ভয় পেয়ে সরকার আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অমৃতসরে প্রায় দুই মাস যাবত কারফিউ জারি থাকে, রাজপথে বিদ্রোহীদের দমনে গুলি বর্ষণসহ নানা রকম অত্যাচার চলতে থাকে। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাঞ্জাবকে কৌশলে অন্যান্য প্রদেশ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ঘটনার প্রতিবাদস্বরূপ তাঁর “নাইট” উপাধি বর্জন করেন। কংগ্রেস এই ঘটনা তদন্তের জন্য কমিটি করে যারা জেনারেল ডায়ারকে এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে

পাঞ্জাবের এই হত্যাকাণ্ডের খবর যখন অন্যান্য প্রদেশের মানুষজন জানতে পারে তখন সারা ভারতের মানুষজন তাদেরকে অত্যন্ত ঘৃণা ও বিদ্বেষের চোখে দেখতে আরম্ভ করে। মূলত এই হত্যাকাণ্ডের পরে ভারতবাসী আরো একবার উপলব্ধি করে যে, ইংরেজরা শুধু শোষণ বৈ শাসন করছে না এবং তাদেরকে এই শোষণের হাত থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মহাত্মা গান্ধী ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে।
এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ঐতিহাসিক Garrot Thompson যথার্থই বলেছেন,

“জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা সিপাহী বিদ্রোহের মতই এক যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *