ডিজিটাল রেভল্যুশন এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতি (Digital Revolution and the Future Politics) পর্ব ২
ডিজিটাল রেভল্যুশনের যুগে ভূরাজনীতি:
আসন্ন ডিজিটাল রেভল্যুশন যে এযাবৎ কাল পর্যন্ত পৃথিবীতে আসা সবচেয়ে বড় রেভল্যুশন হতে চলেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। পৃথিবী পাল্টে দেয়া শিল্প বিপ্লব ও যা পারেনি এই ডিজিটাল রেভল্যুশন সেটিই করার প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিল্প বিপ্লব শুধুমাত্র মানুষের পেশি শক্তিকে পরিবর্তন করেছে আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত নানাবিধ প্রযুক্তিগত যন্ত্র এবং হাতিয়ার দিয়ে।কিন্তু তখনও মানুষের বুদ্ধিমত্তার কোন প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়নি। শারীরিক শ্রমের অনেকটা অংশ মেশিন দিয়ে সম্পাদন সম্ভব হলেও সেগুলো তৈরি এবং নিয়ন্ত্রণের জন্যে এর মানবিক বুদ্ধিমত্তার অপরিহার্যতা ছিলই। কিন্তু ডিজিটাল রেভল্যুশন মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও প্রতিস্থাপন করতে চলেছে। আক্ষরিক অর্থেই মানুষ যা যা পারে “এ আই” বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তার সব কিছুই করতে সক্ষম। অনেক স্মার্ট রোবট শুধুমাত্র মানুষের শারীরিক পরিশ্রমই নয় একই সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যও সম্পাদন করতে পারবে।
মেশিন আসলেই চিন্তা করতে পারে কি পারে না, এমন বায়বীয় বিতর্ককে সরিয়ে রেখে রোবটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েই চলেছে এবং এমনও ভাবা হচ্ছে হয়তো নতুন রোবটবাহিনী মানব সমাজের সদস্যদের কর্মক্ষমতার থেকে অনেক এগিয়ে যাবে এবং তুচ্ছ করে ফেলবে।
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেসব হট টপিক রয়েছে, তার সকলই AI বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর কাছে তুচ্ছ বলে বিবেচিত হবে আর কিছু বছরের মাঝেই। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র, এবং বিশ্ব রাজনৈতিক অন্যান্য মোড়ল দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক বক্তব্যে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তাহলে আমরা দেখবো, চীনের উন্নয়ন, তার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও তার রাজনীতি নিয়ে যতো বক্তব্য এসেছে এটি হয়তো আর মাত্র ২০ বছর চলমান থাকবে। আগামী ২০ বছরের মাঝেই চীনকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক আলোচনায় উন্নয়ন, সংস্কৃতি এর স্থান দখল করবে AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ব্যবহার নিয়ে। তখন চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রধান উপজীব্য প্রশ্ন হয়তো হবে , “চীন কি এখনও শ্রেষ্ঠ আর্টফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্মান করতে পেরেছে?” যদি চীন পারে, তাহলে তারা পুরো পৃথিবীকে নিতে পারবে হাতের মুঠোয়, অবশ্যই যদি তারা চায়। আর যদি না পারে তাহলে কোনভাবেই পারবে না। সেসময়ে এটি নিশ্চিত হয়ে যাবে চীন কি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম কি না।
যুদ্ধ ক্ষেত্রে আর্টিফশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আনবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন, যেগুলো সাংগঠনিকভাবে এবং অস্ত্র শাস্ত্রের দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তাদের কার্যক্রমে ব্যাপক বাঁধার সম্মুখীন হবে। ইতোমধ্যই প্রতিপক্ষ দ্বারা চালকবিহীন বিমান, এবং অন্যান্য সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রযুক্তিগত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের ফলে এসব সন্ত্রাসী সংগঠন যেমন, আই এস আই এস, তালেবান এবং আরও অন্যান্য যেসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আছে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন তারা শুধুমাত্র আত্মঘাতী হামলা ও প্রতিপক্ষকে বাগে পেয়ে হত্যা করে ভয় দেখানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু, যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হবে, তখন আর যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের অংশগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। অত্যন্ত শক্তিশালী এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধরোবট যুদ্ধ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। যাতে করে এসব সন্ত্রাসী সংগঠনের যুদ্ধের স্প্রীহাই কমে যাবে, যদি মানুষই না মারা পড়ে তাহলে যুদ্ধের আর লাভ কি!
খুব সাধারণ করে বলতে গেলে বলা যায় সম্পূর্ণ যুদ্ধ ই তখন হবে মেশিন পরিচালিত। যেটা সারা বিশ্বেই যুদ্ধকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। যদি মানুষের সাহসীকতা আর দক্ষতাই না দেখানো যায়, তবে যুদ্ধের আর মোটিভ কী?
পাশাপাশি যেসব দেশের এই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর সক্ষমতা কম থাকবে তারা তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে অবগত থাকবে এবং জয়লাভের সম্ভাবনা সম্পর্কেও রাখবে সম্যক জ্ঞান। প্রতিক্রিয়ায় অপেক্ষাকৃত কম “এ আই” ক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো তাদের ক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে চাইবে। ফলাফল হিসেবে বর্তমান বিশ্বে চলতে থাকা নিউক্লিয়ার ডিপ্লোম্যাসি পরিবর্তিত হবে আসন্ন “এ আই ডিপ্লম্যাসি” তে।
ডিজিটাল রেভল্যুশন এবং গণ বেকারত্বঃ
বেকারত্ব একটি চিরন্তন ঘটনা। পৃথিবীর ইতিহাসে সব সময়ই বেকারত্বের প্রভাব ছিলো। কিন্তু গত শতাব্দী থেকে একটি নতুন ধারণা ক্রমবর্ধমান ভাবে বেড়েই চলেছে, আর তা হলো Mass Unemployment বা গণ বেকারত্ব। উন্নত দেশগুলো এই বিষয়টির মুখোমুখি হচ্ছে নতুন নতুন বেকারত্ব দূরীকরণ নীতি নিয়ে, অথবা বেকারত্বকালীন ভাতা প্রদানের মাধ্যমে। আর উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোতে এই গণ বেকারত্ব এসেছে একরকম অভিশাপ হিসেবে। প্রায়শই এটিকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে এবং উন্নত দেশগুলোর মতো পরিসর না হলেও কিছু পরিসরে বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে স্বল্পন্নোত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু এরই মাঝে ডিজিটাল রেভল্যুশনের হাওয়া এনেছে নতুন সংকেত। বেকারত্ব সম্পূর্ন বিলোপের পরিবর্তে আরও ব্যাপকভাবে বেকারত্ব সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরী হচ্ছে।
এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্র যেটিকে আমরা উন্নত বিশ্বের নেতৃত্ব হিসেবে দেখি, সেখানেও দশক জুড়ে বেকারত্বের হুমকি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দিনে দিনে অনেক চাকুরীক্ষেত্র আপনা আপনি ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় চলে যাচ্ছে এবং সেই পেশার অসংখ্য মানুষ বেকারত্বের কবলে পড়ছেন।
অনেকেই মনে করছেন বর্তমান বিশ্বের বিস্ময় আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে অযোগ্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর উত্থানও এ বিষয়টির সাথে কিছুটা সম্পর্কিত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের লোকরঞ্জনবাদী নির্বাচনী ইশতেহার Make America Great Again অথবা America First এর প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রের মানুষজনের এমন সাড়া দেয়ার বিষয়টি মূলত চাকরি হারানো এবং চাকুরী হারানোর আশংকা থেকেই উদ্ভূত। ২০১৭ সালে অডিটিং ফার্ম PwC কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণায় আশঙ্কা করা হয় যে ২০৪০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সকল চাকুরীর প্রায় ত্রিশ ভাগ ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় চলে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এসব চাকুরীর বেশির ভাগ ই বিভিন্ন রুটিন চাকুরী যেমন, ফর্কলিফট অপারেটর, এসেম্বলি লাইন ওয়ার্কার, প্যাকেটজাত করনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক ইত্যাদি। এমনকি অনেক হাই স্কিলড কাজ যেমন, মেডিকেল সার্জারী, নোভেল লেখা এবং পাব্লিশ করা পর্যন্ত ২০৪০ সালে এ আই নিয়ন্ত্রিত রোবট করতে সক্ষম হবে।
বর্তমান বিশ্বে মাত্র ১০ শতাংশ বেকারত্বই বড় বড় সব মন্দা নিয়ে আসে। সেখানে যদি এটি ২০ শতাংশ হয়ে যায় তাহলে চাকুরী ক্ষেত্রে বৈশ্বিক জরুরী অবস্থা চালু হবে। রোবট ইতোমধ্যেই মানুষের অনেক কাজ খুব সূক্ষ্ম এবং দক্ষ ভাবে করতে পারে। ২০৪৫ আসতে আসতে সকল কাজই করতে সক্ষম হবে “এ আই” সম্বলিত রোবটগুলো! আর বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দক্ষতা এবং স্বল্প খরচে উৎপাদন নিয়ে যে ব্যাপক উন্মাদনা রয়েছে তাতে উৎপাদকেরা এসব দক্ষ রোবট শক্তিকে লুফে নেবে , যা সৃষ্টি করবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কর্মশূন্যতা বা গণ বেকারত্বের। যা কিনা এই ডিজিটাল রেভল্যুশনকে দিতে পারে একটি হিংস্র রূপ। আরও বৃহৎ ব্যাপার হলো, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন সম্পূর্ণ পরিস্ফুটিত হতে সময় লেগেছে প্রায় ১০০ বছরের মতো, যাতে করে অনেক ব্যাপক পরিবর্তনকে রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে সামাল দেয়ার জন্যে যথেষ্ট সময় পাওয়া গেছে। কিন্ত ডিজিটাল রেভল্যুশন এদিক দিয়ে সম্পূর্ণ অসদৃশ্য। ডিজিটাল রেভল্যুশনের পরিবর্তনগুলো প্রকট হতে বড়জোর কয়েকটি দশক ই যথেষ্ট। আর এ জন্যেই রাজনীতিবিদ এবং সমাজবিদদের যথেষ্ট প্রস্তুত থাকতে হবে। পরিবর্তনের সাথে সংগতিপূর্ণ কোন প্রতিব্যবস্থা যদি দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সেটি জন্ম দিতে পারে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার। অপার সম্ভাবনাময় ডিজিটাল রেভল্যুশন রূপ নিতে পারে সহিংসতায়।
ইতিহাস জুড়ে সমাজের বিভিন্ন পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে রাজনীতিরও। ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন এর ফলে অর্থনৈতিক শক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ ও প্যারাডাইমের আবির্ভাব ঘটেছে পৃথিবী জুড়ে। প্রযুক্তির ফলে মানুষের জীবন যাত্রার মান বেড়ে গেলে সেটি সকলের জন্যে নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। সৃষ্টি হয় আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের। সেরকমই আসন্ন নতুন ডিজিটাল বিপ্লব সমাজে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই আনবে অভাবনীয় পরিবর্তন। তাই রাষ্ট্রের পরিবর্তন ও হবে অনিবার্য। শিল্প বিপ্লবের পরিবর্তন ছিলো অনেকদিন ব্যাপি। পুরোপুরি শিল্প বিপ্লব প্রস্ফুটিত হতে সময় লেগেছে প্রায় একশত বছর। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লব মাত্র কয়েক দশকেই তার ডানা সম্পূর্ন মেলে ধরবে। রাজনীতির মূল যে কাজ সম্পদের সুষম বন্টন, সেটির ধারণাও পালটে যেতে পারে আকস্মিকভাবে। সঠিক রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ ছাড়া বিশ্বের অনেক জাতিই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পতিত হতে পারে। তাই প্রয়োজন ভবিষ্যৎ এর অনিবার্য পরিণতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ থেকে সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা অর্জন।