Explainer

একটা পৃথিবী, একটু ইতিহাস (One Earth, A Little History)

অ্যালেক্স শেখ
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাবি

পৃথিবীর মানচিত্রটার কথা উঠলেই হুট করে চোখের সামনে যেই ছবিটা ভেসে ওঠে, সেটা ‘মারকেটর ম্যাপ’। এই জিনিসটার সঙ্গে আমরা যতই পরিচিত হই, পৃথিবীটা আমাদের কাছে ততই ছোট মনে হতে থাকে৷ তার ওপর ইন্টারনেট নামক বস্তুটার সুবাদে পৃথিবীতো এখন ‘হাতের মুঠোয়’! কিন্তু ক্ষণিকের জন্য যদি একজন ভৌগলিকের মত করে চিন্তা করি, তাহলে অনুধাবন করাটা খুব বেশি কষ্টকর হবে না যে এই ৫১ কোটি বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ভূপৃষ্ঠবিশিষ্ট গোলকটার আকার কত বিশাল! শুধু যে তার আকারটাই তাক লাগিয়ে দেবার মত, তাই নয়, এর চাইতেও বড় বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে তার ইতিহাস।

পৃথিবীতে বর্তমানে প্রাণির প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ৷ এখানে কর্তৃত্ব ঘোষণা করে টিকে থাকবার প্রতিযোগিতায় এই মুহূর্তে আমরা মানবজাতিই সবচাইতে এগিয়ে আছি। চার্লস ডারউইনের সেই ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ (সারভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্ট) মতবাদটা বিবেচনা করলে বলতে হবে, বেশ দাপটের সঙ্গেই যোগ্যতার নিদর্শন রেখে চলেছি আমরা, হাজার হাজার বছর ধরে। আর এতদিন যাবৎ শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে এই পথ চলবার ব্যাপারটা চারটেখানেক কথা নয়! কিন্তু মহাকালের সাপেক্ষে এই বীরগাঁথার সময়সীমার পরিব্যয় কতখানি? প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর ইতিহাসের খুব স্বল্প সময়ব্যাপী আমাদের পরিভ্রমণ, এই সময়টাকে নগণ্য বললে কোনো মতেই ভুল হবে না। বিশ্বভ্রম্মাণ্ডের সৃষ্টি নিয়ে যতগুলো বৈজ্ঞানিক মতবাদ আছে, তার ভেতর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রচলিত মতবাদ, দি বিগ ব্যাং থিওরি অনুসারে মহাবিশ্বটার সৃষ্টি প্রায় ১,৪০০ কোটি বছর পূর্বে। আমাদের এই পৃথিবীটার বয়স ৪৫০ কোটি বছর। আর হোমো সেপিয়েন্স তথা আধুনিক মানুষের বিচরণকাল মাত্র ২ লক্ষ বছর৷ অর্থাৎ পৃথিবীর জীবনকালের মাত্র ০.০০০০৪% সময় ধরে আমাদের যাত্রা চলছে৷ বাকি ৯৯.৯৯৯৯৬% সময় জুড়ে পৃথবীতে মানুষ বলতে কিছু ছিল না! তাই যদি হয়, তবে মানুষের পদচারণের পূর্বে কেমন ছিল সেই পৃথিবীটা?

সূর্যের ৩য় গ্রহ পৃথিবী, মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে গ্যাস পুঞ্জিভূত হয়ে এই কঠিন গোলকের সৃষ্টি। আর সৃষ্টিকালে পৃথিবী এত গতিতে ঘূর্ণায়মান ছিল যে তখন ২৪ ঘণ্টায় নয়, বরং ৬ ঘণ্টায় একদিন অতিবাহিত হতো৷ সেই থেকে ঘূর্ণন গতি কমতে কমতে এখন ২৪ ঘণ্টা। সেই সময়কার পৃথিবীটা ছিল একটা গলিত লাভার গোলক। তারপর অভিকর্ষের কারণে অপেক্ষাকৃত ভারী পদার্থগুলো গোলকের ভেতরে নেমে গিয়ে আয়রন-নিকেলের অন্তস্তল তৈরি করে, আর হালকা পদার্থগুলো ওপরে জমা হয়ে তৈরি হয় কঠিন ভূতলের৷ এই ধাতব অন্তস্তলটার জন্যই পৃথিবীর চৌম্বকবলয়ের উৎপত্তি, যা আমাদেরকে প্রশ্রয় দেয় বিভিন্ন ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে৷ পৃথিবীর সৃষ্টির ঠিক ১০ কোটি বছর পর মঙ্গল গ্রহের সমান আকারের একটা ধূমকেতু পৃথিবীতে আঘাত হানে। ছিটকে যাওয়া অংশগুলো মাধ্যাকর্ষণের কারণে একীভূত হয়ে একটি উপগ্রহ তৈরি করে, যার নাম আমরা দিয়েছি চাঁদ। প্রায় ৪৪০ কোটি বছর আগে, লাভার থেকে তৈরি বাষ্প বায়ুমণ্ডলে জমতে শুরু করে, একটা সময় এই জলীয়বাষ্প পরিণত হয় মেঘে, আর সেই মেঘ থেকে শুরু হয় বৃষ্টি, তুমুল বৃষ্টি, একদম টানা ৬০ কোটি বছরব্যাপী বৃষ্টি! সেই বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয় খালবিলের মত জলাশয়, তার থেকে হয় নদী আর নদী থেকে হয় সমুদ্র। ৩৮০ কোটি বছর আগে, সমুদ্রের পানিতে উৎপত্তি হয় প্রথম ডি এন এ, আর সেখান থেকেই পৃথিবীতে ক্ষুদ্র প্রাণের যাত্রা শুরু। প্রায় ২৫০ কোটি বছর পূর্বে প্রথম অক্সিজেন ভিত্তিক জীবনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব হয়, আর প্রাণ জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে৷ পরবর্তী ২০০ কোটি বছর ধরে উদ্ভব ঘটে হাজার হাজার ভিন্ন প্রজাতির প্রাণির। কিন্তু সেই সকল প্রাণিই ছিল জলজ। ৫০ কোটি বছর আগে প্রাণিজগতে ঘটে ‘কেম্ব্রিয়ান এক্সপ্লোশান’, এই কেম্ব্রিয়ান পিরিয়ডের প্রাণিজগতের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য এখনো ফসিল হিসেবে আবিষ্কার হয়ে চলেছে৷

এখন থেকে ৪০ কোটি বছর আগে প্রথম পানি ছেড়ে মাটিতে যাত্রা শুরু হয় উদ্ভিদের এবং তার কিছুকাল পরেই মাটিতে পদার্পণ ঘটে প্রাণির। শুকনো মাটিতে বিচরণ করা সেই প্রথম প্রাণিগুলোকে আমরা বলি উভচর৷ কিছু উভচর দীর্ঘ সময়ের পরিসরে পরিণত হয় সরীসৃপে এবং সরীসৃপ থেকে পর্যায়ক্রমে স্তন্যপায়ী প্রাণিতে৷ তবে প্রায় ২৫ কোটি বছর পূর্বে আগ্নেয়গিরির কারণে মারা যায় পৃথিবীর প্রায় ৭০% প্রাণি। এটা প্রাণিজগতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিভীষিকাময় ঘটনা হিসেবে পরিচিত, ‘পারমিয়ান এক্সটিংশান’। এরপরই পৃথিবীতে কতৃত্ব শুরু হয় ডায়নসরদের, যার সময়সীমা প্রায় ১৯ কোটি বছর! এই সময়ের ভেতরই ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তীর্ণ সব জঙ্গল জেগে ওঠে। এখন থেকে ৬.৫ কোটি বছর পূর্বে, ধূমকেতুর আঘাতে বিষদ পরিবর্তন ঘটে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে, সূর্যের আলো আর তাপ ভূতলে পৌঁছাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়, তাপমাত্রা খুব দ্রুত হারে হ্রাস পায়। মারা যায় প্রায় ২৫ কেজির বেশি ওজন সম্পন্ন সকল প্রাণি। আর এরই সঙ্গে বিলুপ্তি ঘটে ডায়নসরদের৷ তাদের অনুপস্থিতিতে বিস্তৃতি বাড়তে থাকে স্তন্যপায়ী প্রাণিদের৷ এখন থেকে প্রায় ১ কোটি বছর পূর্বে দেখা মেলে বন মানুষ বা হোমিনিডদের। প্রায় ২৬ লক্ষ বছর আগে তারা প্রথম পাথরের ব্যবহার আয়ত্ত করে, ৮ লক্ষ বছর আগে তারা শেখে আগুনের ব্যবহার৷ তাদের গলা থেকে যেই শব্দ বের হয়, সেটাকে তারা ব্যবহার করতে শেখে মাত্র ২ লক্ষ বছর পূর্বে। তাদের ভোকাল কর্ডকে ব্যবহার করে তারা ভাষা আয়ত্ত করে। পরবর্তী ১ লক্ষ বছর জুড়ে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে বসতি গড়তে থাকে এবং এখন থেকে প্রায় ১ লক্ষ বছর আগে, পুরো পৃথিবী জুড়ে মানুষের বসবার শুরু হয়৷ তারা বসতি গড়ে নদীর পাড় ধরে৷ সেখানেই গড়ে ওঠে সভ্যতা৷ সেই থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রাণিজগতের শীর্ষ স্থানের আসনটায় বিরাজমান আছে মানুষ ৷ অন্তত বিজ্ঞানের মতে ইতিহাসটা এরকমই। কাজেই পৃথিবীর সমগ্র ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, তার যেই গৌরবগাঁথা, তাতে মানবজাতির ভূমিকা নিতান্তই নগন্য। তবে তার প্রগতির হার আর বর্তমান সময়ে পরিবেশের ওপর তার প্রভাব বিবেচনা করলে স্বীকার করতে হবে যে, ভবিষ্যতে পৃথিবীর জীবদ্দশায় পরিবর্তন ঘটাতে তার ভূমিকা আন্দাজ করা দায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *