লুকিং গ্লাস সেলফ (Looking Glass Self)
আফরা ইসলাম রাইসা
একটি শিশুর জন্মর পর ইন্দ্রিয়ই তার সব। আস্তে আস্তে সে নানাভাবে নানা প্রক্রিয়ার দ্বারা সমাজের উপযুক্ত সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়,এ প্রক্রিয়াগুলোকে আমরা সোশালাইজেশন বা সামাজিকীকরণ বলি। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা একজন ব্যক্তি তার জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে অন্যদের কাছে বা সমাজ থেকে শিখতে থাকে। সমাজবিজ্ঞানী George Herbert Mead এবং Charles Horton Cooley এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে ধারণা প্রদান করেন। সামাজিকীকরণ মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেননা সামাজিকীকরণ ছাড়া সমাজে জীবনযাপন একেবারেই সম্ভব হয় না।
Mead এর থিওরী আসে সামাজিক আচরণবাদ নিয়ে। তিনিই প্রথম সামাজিকীকরণে “সেল্ফ” ধারণাটি গড়ে তোলেন, যেটি ব্যাখ্যা করে মানুষের পরিচয় বহিরাগত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং নিজের অভ্যন্তরীণ অনুভূতিগুলোর থেকে উদ্ভূত হয়। এই “সেল্ফ” মানুষের জন্মের সাথে সাথে চেনা যায় না কিন্তু সময়ের সাথে ভাষা, আচরণ এমনকি খেলাধুলার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়। Mead তাঁর “Mind, Self and Society(1934)” বইটিতে মানুষের প্রকৃতি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন মানবসত্তা গড়ে উঠে দুটি অংশ নিয়ে: I and Me। এই ‘Me’ অংশটি হল সামাজিক এবং ‘I’ অংশটি ‘Me’ এর প্রতি উত্তর। অর্থাৎ সমাজ থেকে শেখা আচার, আচরণ, প্রত্যাশা ইত্যাদির প্রতিনিধি এই ‘Me’। আর ‘I’ প্রকাশ করে ‘Me’ এর প্রেক্ষিতে ব্যক্তির পরিচয়। ‘I’ হল সাধারণভাবে আমি আমাকে কেমন করে ভাবি তার প্রতিরূপ। ব্যক্তির এই দ্বিসত্তার ধারণার পাশাপাশি Mead জানান মানুষ অপরের কাছে নিজেকে প্রদর্শন করার আগে নিজেই নিজের একটি চরিত্র সাজিয়ে নেয়। এই চরিত্র সে ধারণ করে তার পরিবার, অভিভাবক, এমনকি পরিচিত সমাজ থেকেই তবে তা একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত। এরপর মানুষ মূলত তার নিজস্বতা ফুটিয়ে তোলে।
সমাজবিজ্ঞানী Cooley এর মতামত Mead এর সাথে এখানে এসেই আলাদা হয় কারণ, Cooley বলেন মানুষ তার আচার আচরণ শেখে জীবনের নানান স্তরে নানান মানুষের থেকে এবং তার এই শেখাকে সে কাজে লাগায় “Looking-Glass Self” থিওরির মধ্যে দিয়ে। Cooley এই Looking-Glass Self তত্ত্বের প্রথম উল্লেখ করেন তাঁর “Human Nature an the Social Order (1902)” নামের বইটিতে। সেখানে Cooley এই ধারণার প্রকাশ করেন যে একজন ব্যক্তির চেতনা মূলত অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করে বিকশিত হয়। সহজ কথায় আমার আচরণে অন্যের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে আমি কিভাবে কাজ করবো। এই ধারণাটির কাঠামো গড়ে উঠেছে মানব মনের সামাজিকতাকে কেন্দ্র করে। মূলত “Looking Glass Self”কে তিনটি উপাদানের উপর ভিত্তি করে সাজানো হয়-
- অন্যদের কাছে ব্যক্তি নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে তা কল্পনা করা
- ব্যক্তির উপস্থাপনায় অন্যের প্রতিক্রিয়া কল্পনা
- সবশেষে অন্যের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে নিজেকে তৈরি করা
এই তত্ত্বগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তবে কখনও কখনও এই জটিল প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে ত্রুটি দেখা যায়। অন্যেরা আমাদের কীভাবে দেখে তা আমাদের জন্য সবসময় সন্তোষজনক নাও হতে পারে। ফলে অনেক সময় আমাদের সিদ্ধান্তগুলো ভুল পথে পরিচালিত হয়। অবশ্য ত্রুটি যেমনই থাকুক, Mead ও Cooley আমাদের “আমি” সম্পর্কে ধারণা বিকশিত করেছেন। এই ধারণা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাই।