ক্ষমতার ভারসাম্য তত্ত্ব (Balance of Power Theory)
“Balance of Power Theory” বা ক্ষমতার ভারসাম্য তত্ত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ নীতি। গ্রিক Thucydides সর্বপ্রথম এর ধারণা দেন তবে ১৭’শ শতাব্দীতে এসে এর বিস্তার ও তত্ত্বীয় গুরুত্ব বেড়ে যায়। David Hume তখন এটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
“ক্ষমতার ভারসাম্য হলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিমান বা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর শক্তি ও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কৌশল”
Palmer and Perkins বলেছে: ক্ষমতার ভারসাম্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলনীতি (“Balance of Power is a basic principle of international relations”)
***Scholars’ definition of Balance of Power:
1.“Whenever the term Balance of Power is used without qualification, it refers to an actual state of affairs in which power is distributed among nations with approximately equality” — Hans. J. Morgenthau.
2.“Balance of Power is such a ‘just equilibrium’ in power among the members of the family of nations as will prevent any one of them from becoming sufficiently strong to enforce its will upon others.” —Sidney B. Fay
3.“Balance of Power is an equilibrium or a certain amount of stability in power relations that under favourable conditions is produced by an alliance of states or by other devices.” —George Schwarzenberger
ক্ষমতার ভারসাম্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় ১৮১৫-১৯১৪ সাল।

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার পদ্ধতি বা উপায়সমূহ: Palmer and Perkins সাতটি পদ্ধতির কথা বলেছেন, নিম্নে সেগুলো ব্যাখ্যা করা হল:-
১.Compensation বা ক্ষতিপূরণঃ কোন দেশের ভূমি দখল বা ভাগ করা যে দেশের ক্ষমতা অন্যান্য দেশের জন্য হুমকি মনে হয়। এটি ১৮-১৯ শতকের খুব গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
উদাহরণ: এই নীতি ব্যবহার করে রাশিয়া পোল্যান্ডকে তিনবার ৩টি অংশে বিভক্ত করে যথাক্রমে ১৭৭২, ১৭৯৩, ১৭৯৫ সালে এবং রাশিয়া, প্রাসিয়া, অস্ট্রিয়া এক একটি ভাগ নেয় এবং প্রত্যেককে সমান কর্তৃত্ব ব্যবহারের ক্ষমতা দেয়া হয়।
পরবর্তীতে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধেও Colonial Power State গুলো সংঘর্ষ বাঁধাতে পারে এমন দেশের ক্ষমতা হ্রাসে এই নীতি প্রয়োগ করে।
২.Alliances and Counter Alliances (জোট ও পাল্টা জোট): Military ও Security চুক্তির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার্থে কয়েকটি দেশ মিলে অনেকসময় যৌক্তিক জোট গঠন করে। এমন জোট আবার পাল্টা জোটেরও জন্ম দেয়। ইতিহাসে এমন অনেক Alliances and Counter Alliances রয়েছে। যেমন: ১৯৪৫ সালের পর NATO, SEATO, Warsaw চুক্তি এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রথম দুইটি Alliance গঠন করে USA এবং এর বিপরীতে তৎকালীন USSR স্নায়ুযুদ্ধের সময় নিজেদের শক্তি বজায় রাখতে Warsaw গঠন করে।
৩.Intervention and Non-Intervention (হস্তক্ষেপ ও হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা): Intervention হলো কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। যখন একটি দেশের অভ্যন্তরীণ কোন সিদ্ধান্তকে প্রতিদ্বন্দ্বী/অপরাপর দেশগুলোর জন্য হুমকি মনে হয় তখন ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য হস্তক্ষেপ করে। আবার অনেকসময় দুটি দেশের যুদ্ধ লাগলেও হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকে কারণ যুদ্ধের মাধ্যমে ওই দুটি দেশের শক্তি হ্রাস হয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ: গ্রীসের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের হস্তক্ষেপ।
Cuba, Nicaragua, Korea, Grenada’র ক্ষেত্রে USA এর হস্তক্ষেপ।
Poland, Czechoslovakia, Hungry এর ক্ষেত্রে USSR এর হস্তক্ষেপ।
বর্তমানেও আমরা দেখি USA অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে এবং অনেক সময় উক্ত দেশগুলোর ক্ষমতার পদ্ধতিই পরিবর্তন করে দেয়। আমেরিকা নিজের Interest থেকে বা Hegemony হিসেবে এসব ভূমিকা পালন করে।
৪.Divide and Rule(ভাগ এবং শাসন): এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি। শক্তি হ্রাস করার জন্য ভাগ করা হয় দেশগুলোকে। ভাগ করার মাধ্যমে তাদের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি ব্যহত হয়।
জার্মানির প্রতি ফ্রান্সের এবং ব্রিটিশ কর্তৃক ইউরোপীয় মহাদেশের দেশগুলোর প্রতি এই পদ্ধতির ব্যবহার অন্যতম উদাহরণ।
৫.Buffer State(গতিরোধক দেশ): দুটো বিবদমান শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মাঝখানে অবস্থিত কম শক্তিশালী ও ছোট দেশ যা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। উক্ত দেশ দুটির সরাসরি সংঘর্ষ রোধে এই দেশ কৌশলী মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা পালন করে। যেমন: বেলজিয়াম ছোট দেশটি ফ্রান্স ও জার্মানির জন্য Buffer State।
৬.Armaments and Disarmaments (অস্ত্রীকরণ ও নিরস্ত্রীকরণ): এটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। অস্ত্রীকরণের মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয় এবং দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে জড়াতে পারে অন্যদিকে নিরস্ত্রীকরণ হলো একটি শান্তিপূর্ণ ও অধিকতর উন্নত মাধ্যম যার মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। নিরস্ত্রীকরণ দ্বারা পারমাণবিক প্রতিযোগিতা বন্ধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
৭.Holder Of the Balance or the Balancer (ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাকারী): Balancer হলো কোন জাতি বা জাতিপুঞ্জ যারা দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। এক্ষেত্রে অনেক সময় Balancer ৩য় পক্ষ হিসেবে চুপ থাকে কিন্তু যখনই বিবদমান দুটি দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হুমকি হয়ে দাঁড়ায় বা তারা ডাকে সমঝোতা করে দেয়ার জন্যে তখন অন্য একটি দেশ Holder of the Balance বা Balancer এর ভূমিকা পালন করে। ব্রিটেন ইউরোপের সমস্যা সমাধানে এই ভূমিকা পালন করে।
Balance of Power তত্ত্বের গুরুত্ব:
১. BOP বিশ্বে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিগত ৪০০ বছর ভূমিকা পালন করছে।
২.BOP বিভিন্ন দেশের মধ্যে কোনরকম যুদ্ধের সম্ভাবনা ছাড়াই গতিশীল সম্পর্ক রক্ষায় কাজ করে।
৩. BOP গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করে।
৪.BOP Giant দেশগুলোর হাত থেকে ছোট ও দুর্বল দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
৫. BOP এর বিভিন্ন পদ্ধতি যুদ্ধকে নিরুৎসাহিত ও থামিয়ে দিতে সহযোগিতা করে।
৬. BOP আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিভিন্ন দেশের মাঝে শান্তি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে Status Quo (যারা নিজ দেশের শান্তি স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্ব দেয়) সম্পর্ক রক্ষা করে।
৭.BOP ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসন বন্ধে ভূমিকা পালন করেছে।
৮. গত শতাব্দীর শেষের দিক থেকে BOP এর মাধ্যমে একাধিক শক্তিমান ও বিপদজনক দেশের সংখ্যা কমে গিয়েছে
Balance of Power তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা: অনেক পন্ডিত ক্ষমতার ভারসাম্য তত্ত্বকে একটি মুর্খ, অবাস্তব পদ্ধতি মনে করেন, কারণ:
১.BOP কিছু ক্ষেত্রে শান্তি বজায় রাখিতে ভূমিকা পালন করলেও অনেকক্ষেত্রেই ব্যার্থ হয়েছে কারণ গত শতকেই দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।
২. BOP সবসময় দুর্বল দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
৩. ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা কখনো যুদ্ধ থামাতে পারে না।
৪. BOP তে জোট গঠন ও জোট ভাঙার কথা বলা হয়েছে, কোন দেশ সহজে ইচ্ছেমত জোট গঠন বা ভাঙতে পারে না।
৫. শক্তিশালী দেশের কারণে শান্তি বিঘ্নিত হয় এ ধারণাটি ভুল কারণ আমরা দেখি USA শক্তিশালী দেশ ও Hegemon হিসেবে ভাল ভূমিকাই পালন করছে।
৬. অনেকগুলো দেশ সমান ক্ষমতা ভোগ করবে এ ধারণাটি সম্পূর্ণ অবাস্তব। কারণ প্রত্যেক দেশই নিজের নিরাপত্তা রক্ষার্থে ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৭. BOP তে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টিও অবাস্তব কারণ বর্তমানে অনেক দেশই অন্য দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজেদের সামরিক ও অন্যান্য শক্তি বৃদ্ধি করছে।