লোকরঞ্জনবাদ: উত্থান এবং উদারগনতন্ত্রের প্রতি হুমকি ( Populism and its Recent Resurgence)
I alone can fix it-Donald Trump
১. প্রেক্ষাপট:
Populism বা লোকরঞ্জনবাদ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার হয় ঊনবিংশ শতাব্দির শেষে এসে। ১৮৭৫ তে আমেরিকা তে শুরু হওয়া কৃষি আন্দোলন কেই সর্বপ্রথম পপুলিস্ট বা লোকরঞ্জনবাদ আন্দোলন নামে আখ্যায়িত করা হয় যাদের প্রধান দাবী ছিলো স্ব্রর্ণের মান কমানো এবং রেল ও টেলিগ্রাফের জাতীয়করণ। পাশাপাশি জার শাসিত রাশিয়ার নারদনিক আন্দোলন এবং ফ্রান্সের বুলাংগিজম আন্দোলন কেও পপুলিস্ট আন্দোলন হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এবার একটু গণতন্ত্রে আসা যাক, গণতন্ত্রকে অনেকেই আখ্যায়িত করেন rule of the people বা “জনগণের শাসন” নামে,কারন যত রাজনৈতিক সংঘ,সংগঠন বা জোটই হোক না কেন, তা হয়েছে এই সাধারন জনগণের মাধ্যমেই এবং স্বভাবতই যে কোন প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার জনগণ বা তাদের দাবীর প্রতি responsive বা সাড়াদায়ক। অপরদিকে জনগণ শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একমাত্র উৎসই নয়,তারাই রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা দুর্নীতিবাজ বা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচুত্য করা বা তাদেরকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের একমাত্র স্বীকৃত মাধ্যম।
সর্বজনস্বীকৃত জনগণের এই ক্ষমতা একদিকে যেমন গনতন্ত্রায়নের ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করে ঠিক তেমনি এই ক্ষমতাই “লোকরঞ্জনবাদ” উত্থানের প্রধান সহায়কের ভূমিকাও পালন করে।
তত্ত্বগত দিক থেকে সার্বভৌম জনগণের ধারণা সরকার এবং জনগণের ক্ষমতার মাঝের পার্থক্যকে তুলে ধরে যা মূলত মধ্যযুগীয় রোমান আইন থেকেই নেয়া, যেখানে তারা জনগণ এবং তার শাসকের ক্ষমতাকে আলাদা করেছিলো। আধুনিককালে সার্বভৌম জনগণের ধারণা জনপ্রতিনিধিত্বের ধারণার মাধ্যমে আরো উন্নতি লাভ করে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে জনগণই শাসক বা সরকারকে নিয়ন্ত্রনে রাখার ক্ষেত্রে প্রধান মাধ্যম। এই সার্বভৌম জনগনের চিন্তাটাই জনগণের নামে সংবিধান তৈরি করে তাদেরকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস হিসাবে উল্লেখ করে এবং পরবর্তিতে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক ও গনতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই জনগণই পথনির্দেশক হিসাবে কাজ করেছে।
২.সংজ্ঞা
লোকরঞ্জনবাদের সংজ্ঞা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এখনো একমত হতে পারেন নি। কেউ লোকরঞ্জনবাদকে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন,কেউ বা করেন রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে। আমরা এখানে লোকরঞ্জনবাদ কে একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে আলোচনা করবো। Encyclopedia of Democracy পপুলিজমের সংজ্ঞায় লিখেছেঃ
“লোকরঞ্জনবাদ এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, যা সাধারণ মানুষের স্বার্থ,সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট এবং স্বভাবজাত অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সুবিধাপ্রাপ্ত স্বল্পসংখ্যক অভিজাতের বিরুদ্ধে গড়ে উঠে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা নৃগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে তারা সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার আবেদনই করে যা উদার গনতন্ত্রের বিরোধী।”
Oxford handbook of Populism লোকরঞ্জনবাদ কে সংজ্ঞায়িত করেছে এ ভাবে যেঃ
“Populism হলো নির্বাচনে জয়লাভের এবং ক্ষমতায় আরোহনের কিছু কৌশল এবং কার্যপদ্ধতির রুপ”।
মূলত পপুলিজম হল এমন একটি নির্বাচনি এবং রাজনৈতিক কৌশল যা রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। তারা সমাজকে দুইটি পৃথক ভাগে আলাদা করে যেখানে একদিকে থাকে “বিশুদ্ধ সাধারণ মানুষ” এবং অপরদিকে থাকে “দুর্নীতিগ্রস্থ অভিজাত সম্প্রদায়“ যাদের কারনে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে তারা বৈষম্যের শিকার ।
এক কথায় পপুলিজম বা লোকরঞ্জনবাদের সংজ্ঞায়নে আমরা বলতে পারি যে,
“নব্য উদারনীতিবাদের এই যুগে যখন মুষ্টিমেয় ব্যক্তি নিজেদের মেধা বা যোগ্যতার কারনে সমাজের অন্যান্য শ্রেনী থেকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির হতাশা এবং ক্ষোভ কে পুজি করে যে ডান কিংবা বামপন্থী ব্যক্তি বা দল চিত্তাকর্ষক ব্যক্তব্য ও আচরণের মাধ্যমকে নির্বাচনে জয়লাভের প্রধান অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে তাই লোকরঞ্জনবাদ।”
তারা সাধারণ মানুষের সেই হতাশা ও বঞ্চনার জন্য ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করে এবং বেকারত্ব,অর্থনৈতিক অসাম্য বা উদ্বাস্তু সংকটের মত জটিল ও সময় সাপেক্ষ জাতীয় সমস্যাকে খুব সোজা সাপ্টা উত্তর দিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেমন ২০১৬ তে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আমরা ডোনাল্ড ট্রাম্প কে দেখি দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা কে মোকাবেলা করার জন্য বলেছিলেন তিনি একাই যথেষ্ট (He said: I alone can fix it),কিন্তু হিলারি ক্লিনটনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছিলাম এই একই সমস্যা মোকাবেলায় বিভিন্ন দীর্ঘ মেয়াদী পলিসি গ্রহণের কথা বলতে।
৩. লোকরঞ্জনাবাদিতার উত্থানের কারন
শিল্পায়ন থেকে উত্তর শিল্পায়নের যুগে রুপান্তর সমাজকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করে দিয়েছে। লোকরঞ্জনবাদের উত্থানের পিছনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ বেশ কিছু কারন বের করেছেন। লোকরঞ্জনবাদ সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই আমাদেরকে এর উত্থান এবং তার পিছনের কারণ সম্পর্কে জানতে হবে। আমরা মোটা দাগে চারটি কারণ পাই ।
- বিশ্বায়নের এই যুগে শুধু মাত্র শ্রম বা কায়িক শ্রমের উপর বেচে থাকা ব্যক্তিরা বিভিন্ন বিপদের সম্মুখীন হন যেখানে সমাজে অর্থনৈতিকভাবে বেচে থাকতে হলে তাদেরকে একটি থেকে আরেকটি কর্মে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং সক্ষম হলে উদ্যোক্তা হওয়াটা জরুরী। কেননা বেকার, আধা-বেকার ও অনিপুণ বা অদক্ষ ব্যক্তিরা বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির উন্নতির দ্বারা সর্বদাই হুমকির মাঝে থাকেন। ফলফল হিসাবে সাধারণ মানুষ প্রধান ধারার রাজনীতি দ্বারা নিজেদেরকে প্রতারিত বলে ভাবতে শুরু করেন। কেননা এই প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলোই বিশ্বায়নকে ঘিরে রাখা বাজার কেন্দ্রিক এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবায়নকারী। আর এই মোক্ষম সুযোগটিকে লোকরঞ্জনবাদরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।
- লোকরঞ্জনবাদের উত্থানের প্রধানতম কারন হলো সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং গনতান্ত্রিক সরকারের দুর্বলাবস্থা এবং সংস্কারে ধীরগতি সম্পন্নতা। আবার দুর্নীতি যখন সর্বব্যাপিতা অর্জন করে বিশেষ করে রাজনৈতিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে সাধারণ জনগণ তাদের শাসকবর্গ দ্বারা অন্যায্য ও অসাম্যের শিকার হয় এবং গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে নতুন কোন পন্থার আশ্রয় খুজতে থাকে তখনি ঘটে লোকরঞ্জনবাদের আবির্ভাব। তাই লোকরঞ্জনবাদকে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যর্থতা,ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্বল আইনের শাসনের ফলাফল হিসেবে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যথাযতই বিবেচনা করেছেন।
- জনগণের কাছে গুরুত্ত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে প্রধানধারার রাজনৈতিক দলগুলো যখন উপেক্ষা করে এবং নির্বাচনী ইশতিহারে আশাজাগানিয়া দাবীগুলো কে বাস্তবায়ন না করে তখন জনগনের মাঝে বড় ধরণের অবিশ্বাস জন্মায় যার সরাসরি ফলাফল ভোগ করে লোকরঞ্জনবাদীরা। উদ্বাস্তু সংকট যখন ইউরোপের জন্য সস্তায় শ্রমিক পাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায় তখন সাধারণ মানুষকে সেই বৈষম্য দেখিয়ে লোকরঞ্জনবাদীরা জনগণের সামনে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে তুলে।
- এই রাজনৈতিক দুর্বলতা,আইনের শাসনের অভাব এবং অসাম্যের মাঝে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে নিজের পুরনো আত্নপরিচয় কে হারিয়ে নতুন পরিচয়ের সন্ধানে থাকে তখনি এই লোকরঞ্জনবাদীরা তাদের কে নতুন আত্নপরিচয় দান করে যেখানে সে থাকে খাঁটি কিন্তু সাধারণ জনগন এবং তাদের আত্নপরিচয় খোয়ানোতে যোগানদাতা সকলে তারা শত্রু হিসাবে বিবেচিত করে।
৪. লোকরঞ্জনবাদ কি উদারনৈতিক গনতন্ত্রের প্রতি হুমকি স্বরুপ?
লোকরঞ্জনবাদ এর উত্থান প্রধানতই উদার গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতার কারনে । অন্যদিকে তা উদার গনতন্ত্রের প্রধান ধারাগুলোর ক্ষতিসাধন করে এর বিকল্প হিসাবে গড়ে উঠতে চায়। লোকরঞ্জনবাদ মূলত Exclusive বা বর্জনমূলক ধারার রাজনীতি, যেখানে সেই বর্জনের শিকার হতে পারে কোন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা অভিজাত সম্প্রদায়। তারা স্বভাবতই গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সমূহকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং শাসনক্ষমতার সব স্বাধীন ভিত্তিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায়। ক্ষমতায় আরোহনের পর লোকরঞ্জনবাদী নেতা বা দল নির্বাচিত কতৃত্ববাদী (Elected Authoritarian) সরকারে পরিণত হয়। লোকরঞ্জনবাদ সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা বললেও তা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার এবং Pluralism বা বহুত্ত্ববাদের প্রতি হুমকির মুখে ফেলে দেয়। লোকরঞ্জনবাদ রাজনীতি কে দুর্বল করে সেখানে সমঝোতা এবং ঐক্যমতে পৌছানো কে অসম্ভব করে তুলে,আদর্শবাদী প্রধানধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরণের উদাসীনতা তৈরী করে এবং সমাজে এক ধরণের নতুন বিভাজন সৃষ্ট্রি করে যা উদারনৈতিক গনতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
সুতরাং যদিও গনতন্ত্রের দুর্বলতাকে কেন্দ্র করেই লোকরঞ্জনবাদের আবির্ভাব কিন্ত এই লোকরঞ্জনবাদই প্রধান ধারার রাজনৈতিক দল গুলোকে তাদের ভুলগুলোকে শোধরানোর সুযোগ এনে দেয়। তবে দেখার বিষয় এটাই যে উদার গনতন্ত্র কিভাবে লোকরঞ্জবাদের ধাক্কা কে সামলে উঠে। ভবিষ্যতই আমাদের কে সেই উত্তর দিয়ে দিবে।
তথ্যসূত্রঃ
- Kaltwasser.Cristobal, paula Trigger and pierre ostiguy (2017) Populism: an overview of the concept and the state of the art, Oxford University Press.
- Weyland.Kurt,(2017) Populism: A Political-Strategic Approach. Oxford University Press.
- Rummens,Stefan, (2017), Populism as a threat to Liberal Democracy. Oxford University Press.
- Hawkins,Kirk,Madeleine Read and Teun Pauwels,(2017) Populism and Its causes. Oxford University Press.
- Taylor,Charle,(2016) Is Democracy slipping away?. The Democracy Press
- Plattner,F Marc (2010), Populism, Pluralism and Liberal Democracy, volume 21, Journal of Democracy.
- https://www.bbc.com/news/world-43301423. Last access at 10-10-18 on 1:08 AM