সামাজিক প্রকৌশল (Social Engineering)
ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি এতকাল ব্যবহৃত হয়েছে প্রকৌশল বিজ্ঞান বুঝাতে। গৃহ, কলকারখানা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, অস্ত্র, যন্ত্র, যানবাহন, কম্পিউটার, স্পেসসায়েন্স ইত্যাদির উন্নয়নে ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যার অবদান অপরিসীম। যান্ত্রিক সভ্যতার বিস্ময়কর উন্নয়নের মূলে বস্তুত এই ইঞ্জিনিয়ারিং। এক্ষেত্রে অগ্রগতির ফলে বিগত একশত বছরে বিজ্ঞান যতটা সামনে এগিয়েছে তা মানব ইতিহাসের বিগত বহু হাজার বছরেও এগোয়নি। সবচেয়ে দ্রুত এগিয়েছে বিগত ৫০ বছরে। বলা যায়, পৃথিবীতে যত বিজ্ঞানী আজ জীবিত আছে, ইতিহাসের সমগ্র বাকি সময়ে হয়তো তার সিকি ভাগও জন্ম নেয়নি। তবে যান্ত্রিক উন্নয়ন বিস্ময়কর গতিতে ঘটলেও চেতনা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও বাঁচবার রুচিবোধে মানুষ সামনে এগিয়েছে সামান্যই।
ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি সাধারণত প্রকৌশল বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত করে ব্যবহৃত হলেও এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সামাজিক বিজ্ঞানে ব্যবহৃত সামাজিক প্রকৌশল (Social Engineering) নিয়ে। সামাজিক প্রকৌশল (Social Engineering) হলো সামাজিক বিজ্ঞানের একটি ধারা। সামাজিক প্রকৌশল (Social Engineering) বলতে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে অভিপ্রেত চারিত্রিক বৈশিষ্টগত পরিবর্তনের জন্যে সে সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী ও পারস্পরিক সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টাকে বুঝানো হয়। আর এ সকল প্রচেষ্টা কখনও পরিচালিত হয় সরকার কখনও মিডিয়া আবার কখনও বা প্রাইভেট গ্রুপের দ্বারা।
সামাজিক প্রকৌশল বা Social engineering টার্মটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮৯৪ সালে জার্মান শিল্পপতি জে. সি. ভ্যান মার্কেন এর একটি রচনার মধ্যে। যেখানে তিনি সামাজিক প্রকৌশলী (Social Engineer) টার্মটি প্রচলিত প্রকৌশল বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেন। তার বক্তব্য ছিলো, যেভাবে আধুনিক একটি অফিসের কর্মকর্তারা সেই অফিসের যাবতীয় বস্তুগত সমস্যা সমাধানের জন্যে প্রথাগত প্রকৌশলীদের স্মরণাপন্ন হন ঠিক একইভাবে মানবীয় সমস্যা সামলানোর জন্যে তাদের সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ করা দরকারি।
১৮৯৯ সালে আমেরিকায় প্রথম টার্মটির ব্যবহার চোখে পড়ে। সে সময় “Social Service” নামে একটি জার্নালে ‘Social Engineering’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তারপর থেকেই মূলত বিভিন্ন লেখায় এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হয়। এবং ক্রমেই সামাজিক প্রকৌশল (Social Engineering) সমাজ বিজ্ঞানের একটি ধারা হয়ে ওঠে।
সামাজিক প্রকৌশলঃ
রাষ্ট্রপরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা Decision making অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জাতিরাষ্ট্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের উৎপত্তির সাথে সাথে ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উত্তরোত্তর বেড়েছে বই কমেনি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোটি কোটি মানুষের নিরাপত্তা এবং অস্তিত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ফার্ডিনান্দ টনিস ১৯০৫ সালের বই “The Present Problem of the Social Structure” তে ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, সমাজ তার পুরোনো হয়ে যাওয়া ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে (Social management method) আর বেশিদিন চলতে পারবে না। সামাজিক ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে তাকে অবশ্যই সর্বাধুনিক কার্যকৌশল (technic) রপ্ত করতে হবে। এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানিক উপাত্তের বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যে এইসকল কলাকৌশল ব্যবহার করতে হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় সামাজিক প্রকৌশল বা Social Engineering একটি ডেটা ভিত্তিক (Data-based) বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, যা কিনা সমাজের জন্যে একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর এবং মানব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে।
কিন্তু ইদানীং কর্তৃত্ববাদী রেজিমিগুলোর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সামাজিক প্রকৌশলের ব্যবস্থাটি অপব্যবহৃত হয়ে চলেছে। যার ফলস্বরুপ সামাজিক প্রকৌশল বা Social Engineering টার্মটি শোনা মাত্রই আমাদের মানসপটে একটি নেতিবাচক চিন্তা ভেসে ওঠে। নেতিবাচকভাবে সামাজিক প্রকৌশল সাধারণত ব্যবহৃত হয় ব্যাপক পরিমাণের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং সেগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠির আচরণকে স্বার্থ অনুযায়ী প্রভাবিত করার অর্থে। যদিও ব্রিটেন এবং কানাডায় জনগণের সমসষ্টিগত আচরণকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোন একটি দিকে ধাবিত করাকে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুগে যুগে সরকার অতি সুক্ষ্মভাবে জনগণের আচরণ প্রভাবিত করার পন্থা চালু রেখেছে। এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন প্রলোভন (Incentive) এবং অর্থনৈতিক পলিসি, ট্যাক্স পলিসি এবং আরও অনেক পলিসিতে সুক্ষ্মভাবে জনমত প্রভাবিত করণের উপকরণ রেখেই চলেছে।
সামাজিক প্রকৌশল যেভাবে কাজ করেঃ
সামাজিক প্রকৌশল বা সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর পূর্বশর্ত হলো তথ্যের প্রতুলতা। যেই সমাজে সামাজিক প্রকৌশলের মাধ্যমে সামাজিক বৈশিষ্টাবলি পরিবর্তনের প্রচেষ্টা করা হবে সে সমাজ সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য-উপাত্ত এবং সেগুলো বিশ্লেষণের ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে সোসাল ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে। ইউরোপে ছাপাখানা আবিষ্কারের পূর্বে, তথ্য শুধুমাত্র সম্পদশালী ব্যক্তিদের আওতাভুক্ত ছিলো। কেননা সে সময়কার তথ্য প্রাপ্তির মাধ্যমগুলো ছিলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল যা সর্বস্তরের মানুষের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু ছাপাখানার আবিষ্কার, এবং সেখান থেকে শুরু হওয়া তথ্য-প্রযুক্তির এখনকার যুগে তথ্য সকলের কাছে সহজলভ্য হয়েছে। এবং বর্তমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সেসব তথ্যকে নিয়ে এসেছে একদম সকলের হাতের মুঠোয়। যে কারণে বর্তমানে শুধুমাত্র রাষ্ট্রই নয়, বরং আরো ছোট পরিসরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা ছোট পরিসরের সাংগঠনিক উদ্যোগে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও সামাজিক প্রকৌশল সম্ভব। যে কারণে বর্তমানে সামাজিক প্রকৌশলের অনেক অপব্যবহার আমরা লক্ষ্য করছি এবং এই দিকটি অনেকাংশেই সমাজের জন্যে হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
সামাজিক প্রকৌশলের কিছু নমুনাঃ
প্রবন্ধের এই অংশে আমরা বিশ্বজুড়ে সংঘটিত সামাজিক প্রকৌশলের কিছু নমুনা আলোচনার প্রয়াস পাবো। সবচেয়ে ব্যাপৃত এবং প্রভাবশালী সামাজিক প্রকৌশল- যেগুলো ব্যক্তিজীবন, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি তাদের মনোজগতে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তার প্রায় সবই শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কতৃপক্ষের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ-
- সোভিয়েত ইউনিয়নের নতুন সোভিয়েত মানুষ (New Soviet Man) সৃষ্টির উদ্যোগ :
অত্যন্ত ব্যাপক এবং প্রভাবশালী সামাজিক প্রকৌশলগুলো সাধারণত পরিচালিত হয় কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের দ্বারা। ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর সোভিয়েত সরকার পূর্বতন জারতান্ত্রিক রাশিয়া থেকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াতে পরিবর্তনের লক্ষ্যে ব্যাপক ক্যাম্পাইন পরিচালনা করে। যার উদ্দেশ্য ছিলো, জারতান্ত্রিক রাশিয়ার সংস্কৃতি অধুনা সোভিয়েত রাশিয়ার নাগরিকদের মন থেকে মুছে ফেলে নতুন একটি সোভিয়েত সংস্কৃতি গড়ে তোলা। সর্বোপরি একদল “নতুন সোভিয়েত মানব” (New Soviet Man) তৈরি করা। আর এজন্যে সোভিয়েত সরকার পত্রপত্রিকা, বই, সিনেমা, সকল গণমাধ্যম এমনকি স্থাপত্যশৈলীর মধ্য দিয়েও মানুষকে প্রভাবিত করে তাদের মূল্যবোধ পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালায়।
- চীনের গ্রেট লিপ ফররয়ার্ড (Chinese Great Leap Forward) এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব (Cultural Revolution) :
সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই মাও সে তুং এর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক চীন “গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড” নামে একটি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে যার লক্ষ্য ছিলো কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে চীনকে একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়া। এবং এজন্যে সেসময় ব্যাপক ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এবং সামষ্টিক কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়।
সাংস্কৃতিক বিপ্লবও মাও সে তুং এর আমলে পরিচালিত একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্যাম্পেইন। “গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ড” এর ব্যর্থতার পরে এই ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়, এবং এটি ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চালু থাকে। এই ক্যাম্পেইনটি মূলত ছিলো মাও সে তুং এর আদর্শকে পুনরায় মানুষের মর্মে প্রোথিত করবার আরেকটি উদ্যোগ। ১৯৬৬ সালে গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ডের কার্যকারিতা হারানোর পরে মাও ঘোষণা করেন, চীনে প্রচলিত বুর্জুয়া পণ্য সামগ্রী সরকার এমনকি বৃহত্তর অর্থে সমাজকে কলুষিত করে ফেলেছে এবং পুঁজিবাদকে পুনর্বহাল করার ইন্ধন জোগাচ্ছে। তখন চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি ব্যাপকভাবে এই প্রচারণা চালাতে থাকে এবং জনমানুষের আচার-আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত করতে থাকে।
- মিশরে জেনারেল সিসির সামাজিক প্রকৌশল :
২০১৩ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসিকে একটি সামরিক অভ্যুত্থান এর মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই কর্তৃত্ববাদী শাসক জেনারেল সিসি সেদেশে সামাজিক প্রকৌশলের চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। মূলত মুরসীর ক্ষমতায় আরোহনের পর থেকেই মিলিটারি এবং মিশরীয় ইন্টেলিজেন্স সমর্থিত মিডিয়া মুরসীর প্রতিটি পদক্ষেপের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কঠোর সমালোচনা করতে শুরু করে এবং এক বছর ধরে এটি চালু রাখে।
এই ব্যাপক প্রচারণা মুরসী বিরোধী দলগুলোকে একাট্টা হতে এবং জনসমর্থন পেতে ব্যাপক সাহায্য করে। মুরসী বিরোধীরা ২০১৩ সালের জুন মাসে তাহরির স্কয়ারে একত্রিত হতে সক্ষম হয় এবং মুরসীর এক বছরের শাসনের ইতি টানতে বাধ্য করে। যদিও এ সময় মুরসীর অনেক সমর্থক রাস্তায় নেমে আসে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই সেনাবাহিনী পরিচালিত রাবা ম্যাসাকারে (Raba massacre) মারা পড়ে। এবং এতো বড় ঘটনাকে আগে থেকে বিদ্যমান সামাজিক প্রকৌশলের হাতিয়ার (Tools) ব্যবহারের মাধ্যমে সন্ত্রাস দমন বলে চালিয়ে দিতে সিসি সক্ষম হয়। মিশরীয় গণমাধ্যমের উপরে সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং সামাজিক প্রকৌশলীদের কাজে সহায়তার জন্যে সিসি তার বিরোধী সকল সংবাদ মাধ্যম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এবং শুধু তাতেই সিসি থেমে না থেকে ইন্টারনেটের VPN (Virtual Private Network) সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন।
যার ফলে অন্য দেশের কোন নিরপেক্ষ সংবাদ মাধ্যম থেকে সংবাদ পাওয়াও জনগণের জন্যে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এবং এতে করে সারাক্ষণ সিসির গুণগান চলতে থাকা টিভি এবং রেডিও চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে সিসি তার জনগণের আচরণকে তার পক্ষে প্রভাবিত করতে অনেকাংশেই সক্ষম হন. সিসি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে আসা বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে স্কুলগুলোতে পর্যন্ত সামাজিক প্রকৌশলের ব্যবস্থা পোক্ত করেন। সম্প্রতি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় স্কুলের বাচ্চাদের প্রতিদিন “মহান সিসি দীর্ঘজীবী হোন” বলে জপ করানো হয়।
- কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের নির্বাচন :
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের নির্বাচনের পরে দেশটিতে সর্বকালের অদ্ভুতুড়ে প্রেসিডেন্ট বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছেন। যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হবার ঘোষণা আসে, তখন শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ডেমক্রেটসরাই নয় সারা পৃথিবীর জনসাধারণ পর্যন্ত যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে এই নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন, অভিযোগ এবং সন্দেহ আসতে শুরু করে নির্বাচনের একদম পর পর থেকেই। যেগুলোর মাঝে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা, মার্ক জাকার্বাগ এবং ফেসবুক প্রসঙ্গটি অত্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টিকারী। বিষয়টির মিমাংসা এখনও হয়নি, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মূলত ২০১৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা অত্যাধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সমন্বয়ে সামাজিক প্রকৌশল বা সোসাল ইঞ্জিনিয়ারিং করতে সক্ষম হয়। যার ফলাফল হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসে সবচেয়ে খামখেয়ালি এবং (অযোগ্য?) প্রেসিডেন্ট উপহার পায়
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এর সাথে কিছু তথ্য বিনিময়ের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ ছিলো। কিন্তু সম্প্রতি জানা গেছে ফেসবুকের অজান্তেই কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কয়েক কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে এবং সেসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে বেসরকারী উদ্যোগে সম্পন্ন সামাজিক প্রকৌশলগুলোর মাঝে সবচেয়ে ব্যাপক এবং প্রভাবশালী।
সামাজিক প্রকৌশল বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কতৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। এবং এর ফলাফলও এটির পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ভিন্নতর হয়ে থাকে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে বিশ্বজুড়ে চলা efficiency craze বা দক্ষতা বৃদ্ধির উন্মাদনার সময়ে সামাজিক প্রকৌশলের ধারণাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং এর অধিকাংশ তাত্ত্বিক উন্নয়নও সে সময়েই সংঘটিত হয়। যদিও উদ্ভাবনের সময়ে এর সাধারণ উদ্দেশ্য ইতিবাচক থাকলেও পরবর্তীতে এর বিভিন্ন অপব্যবহার বিশ্ববাসী পর্যবেক্ষণ করেছে। শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়তা লাভ উদ্দেশ্য থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন স্বার্থবাদী মহল এবং কর্তৃত্ববাদী শাসক মণ্ডলীর দ্বারা এটি বিভিন্নভাবে শুধু অপব্যবহারই হয়েছে। এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তশালী গণতন্ত্রের মাঝেও সামাজিক প্রকৌশল ব্যবহার করে জনসাধাণের মতামতকে ম্যানিপুলেট করা সম্ভব হয়েছে।
তাই শেষমেশ কোলকাতার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক এবং বিখ্যাত “চন্দ্রবিন্দু” ব্যাণ্ডের গীতিকার চন্দ্রীল ভট্টাচার্যের গণতন্ত্র সম্পর্কে হাস্যরস- “গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে গণ অর্থাৎ জনগন বিশাল আলাপ-আলোচনা-তর্কাতর্কির মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্ত নেয়, এবং ইলেকশনের পর যিনি নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাকে দেখে সবাই বলে উঠে “ওমা! একি! একে আবার কে নির্বাচন করলো?” – উক্ত করে বলতে হয়, যতোদিন পর্যন্ত সামাজিক প্রকৌশলের নেতিবাচক ব্যবহার বন্ধ না হবে, ততদিন পর্যন্ত গণমানুষের নিজের ভালো নিজে বুঝতে পেরে কাজে লাগানোর স্বাবলম্বিতা অর্জন সম্ভব হবে না।