Explainer

সামাজিক চুক্তি মতবাদঃ প্রথম পর্ব-থমাস হবস (The Social Contract Theory: Hobbes)

রাষ্ট্রের উৎপত্তি কে কেন্দ্র করে যে সকল তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভূমিকা রেখে চলেছে  তন্মধ্যে সব চেয়ে বেশি গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয় সামাজিক চুক্তি তত্ত্বকে (Social Contract Theory)। সামাজিক চুক্তি কে কেন্দ্র করে আমরা প্রধানত ৩ জন প্রখ্যাত দার্শনিকের ধারনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি জানতে পারি।তারা হচ্ছেন থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯), জন লক (১৬৩২-১৭০৪) এবং জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো (১৭১২-১৭৭৮)। ইউরোপীয় নবজাগরণের (Renaissance) সময়ে ১৭শ এবং ১৮শ শতকে এই সামাজিক চুক্তি মতবাদ বেশ প্রভাব ফেলে রাষ্ট্র উৎপত্তি এবং তার অবস্থান তৈরিতে।

তবে এই সময়ে সামাজিক চুক্তি মতবাদ থমাস হবসের (Thomas Hobbes)  দ্বারা প্রথম সামনে এলেও আমরা একেই প্রথম বলে ধরে নিতে পারি না। কেননা প্লেটোর রচনা ক্রিতো (Crito) তে সর্বপ্রথম সক্রেটিসের মুখে আমরা সামাজিক চুক্তির কথা শুনতে পাই। প্রহসনমুলক সাজানো বিচারে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে যখন ক্রিতো তাকে তা না মেনে নিতে বলছিলো তখন সক্রেটিস ক্রিতো কে মনে করিয়ে দেন রাষ্ট্রের সাথে জনগণের চুক্তির কথা।  তার সেই ইঙ্গিতেই আমরা প্রথম সামাজিক চুক্তি মতবাদের কথা জানতে পারি।

হবস তার সামাজিক চুক্তি মতবাদটি সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন তার লেভিয়াথান (Leviathan)  গ্রন্থে ১৬৫১ সালে বৃটেনের গৃহ যুদ্ধের সময়ে। তার ভাষ্যানুযায়ী, মানুষ প্রথমে প্রকৃতির রাজ্যে (State of Nature) বসবাস করত যা ছিলো তাদের জন্য একদিকে ভয়ের অপরদিকে  স্বার্থপরতার।  প্রকৃতির রাজ্যে (State of Nature) নিত্য ভয়ের মাঝে এক বিশৃঙ্খল অবস্থায় মানুষ বসবাস করতো। আর প্রকৃতির রাজ্যকে হবস বর্ননা করেছেন “সঙ্গিহীন, জীর্ণশীর্ণ, পাশবিক, বিপদজনক ও ক্ষনস্থায়ী হিসাবে।“  হবস প্রকৃতির রাজ্যকে চিত্রায়িত করেছেন আইনবিহীন একটি সমাজব্যবস্থা হিসাবে যেখানে মানুষ সর্বদাই আতঙ্কের মাঝে বিরাজ করতো এবং তাদের জীবন হুমকির মুখে থাকতো এবং তাদের নৈতিকতারও (Morality) স্থান ছিলো না সেখানে। এ ক্ষেত্রে হবস নৈতিকতাকে আইনের (Law)  উপর নির্ভরশীল বলে যুক্তি দিয়েছেন। উদাহরণস্বরুপ হবস বলেছেন যে, রাত্রে ঘুমানোর সময় আমরা দরজা বন্ধ করেই ঘুমাই কেননা আমরা জানি যে মানুষের স্বভাবের ভিতরেই সুপ্ত রয়েছে তার আত্মকেন্দ্রিকতা এবং স্বার্থপরতা যার জন্য আইনবিহীন রাজ্যে বা ব্যবস্থায় সে তার স্বার্থ পূরনের জন্য চুরি থেকে হত্যা, কোনটিই করতে দ্বিধান্বিত বোধ করবে না।

পাশাপাশি প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেক ব্যক্তিরই ছিলো নিজস্ব কিছু মানবিক চাহিদা যেমন খাদ্য,বস্ত্র এবং  বাসস্থান, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী যোগান না থাকায় সবাই ছিলো স্বার্থপর এবং  অপরদিকে ক্ষমতার বন্টন নিয়ে ছিলো একটি প্রকট সমস্যা যেখানে  একজনের দুর্বলতাই ছিলো অপরজনের শক্তির কারন।  সুতরাং আইনবিহীন সে রাজ্যে প্রত্যেককে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য সংঘাত ছিলো অনিবার্য। কেননা প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেকেই স্ব স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয় এবং  নিজেদের সেই স্বার্থের অনুসারে আচরণ করে।

তাই সেই সংঘাতকে এড়ানোর জন্য দরকার ছিলো মানুষের মাঝে এক ধরনের পারস্পরিক  চুক্তি (Mutual Agreement)  যার মাধ্যমে তারা অনিবার্য হয়ে পড়া পারস্পরিক সংঘাত (War) থেকে নিজেদের কে বাঁচাতে পারবে।

সেই চুক্তির দুটি অংশের একটি হবে ব্যক্তির স্বার্থে আঘাত না হানা এবং তাকে রক্ষা করা অপরটি হবে নিজেদের দেওয়া কথা বা চুক্তিকে টিকিয়ে রাখা।  হবসের ভাষায় এটাই হবে সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

তাই প্রকৃতির রাজ্য থেকে নিজেদের কে বাচানোর জন্য এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং নিরাপত্তার জন্য মানুষ নিজেরাই একটি পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যেখানে তারা স্বেচ্ছায়  নিজেদের অধিকার এবং স্বাধীনতাকে এক বা একাধিক ব্যক্তির কাছে সোপর্দ করে।  এটাই  তাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করার এবং তাদের চুক্তিকে রক্ষা করার জন্য পরাক্রমশালী শাসক বা সার্বভৌমের সৃষ্টি করে যে বা যারা হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি। আর এভাবেই সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে।

তবে হবসের ভাষায়, জনগনের কোন অধিকার নেই শাসক বা সার্বভৌমের বিরুদ্ধে যাওয়ার, সেই সার্বভৌম যতই অপকৃষ্ট ও অযোগ্য হোক না কেনো। পাশাপাশি হবস রাজতন্ত্র (Monarchy) কে দেখেছেন সবচেয়ে যোগ্য রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান এবং সরকার ব্যবস্থা হিসাবে।

হবস পরবর্তী সময়ে জন লক (John Locke)ছিলেন সামাজিক চুক্তি মতবাদের অন্যতম একজন তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক। জন লক তার সামাজিক চুক্তিতে থমাস হবসের সাথে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষন করেছেন। জন লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্য হবসের ভাষার মত ততটা পাশবিক ছিলো না। সেখানে মানুষ মুটোমুটি ভালোই জীবন যাপন করছিলো তবে তাতে কোন আইন ছিলো না যা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রক্ষা করবে।

লক মানব সমাজের চরিত্র নিয়ে হবসের ন্যায় হতাশাবাদী ছিলেন না। এবং লক এ ব্যাপারে হবসের সাথে একমত পোষন করতেন না যে, নৈতিকতা আইন এবং সরকারের উপর ভিত্তি করে,  বরঞ্চ তিনি প্রকৃতির রাজ্যকে বেশ ভালো এবং বাসযোগ্য বলে বিবেচনা করতেন। কারন হিসেবে লক বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃতির রাজ্যে নৈসর্গিক আইন (Natural Law) ছিলো যাকে ঈশ্বর প্রদত্ত আইন বলে বিবেচনা করা হত এবং মানা হত।

থমাস হবসের জীবন এবং তার  সামাজিক চুক্তি মতবাদ  অনুপ্রাণিত হয়েছিলো ইংল্যান্ডের ৩০ বছর স্থায়ী যুদ্ধ দ্বারা,, যা তার মানসপটে মানব চরিত্র সম্পর্কে একটি হতাশাবাদী চিত্র ফুটিয়ে তুলে এবং  তার ভিতর  এই দৃঢ় বিশ্বাস সঞ্চিত করে যে, সামজিক স্থিতিশীলতা আনয়নে  নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রই (Absolute Monarchy)  হলো একমাত্র সক্ষম শাসক গোষ্ঠি।

অপরদিকে জন লকের আধ্যাত্মিক (Intellectual)  বিকাশ ঘটে গৃহ যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এবং রাজনৈতিকভাবে  তিনি ছিলেন হুইগ গোষ্ঠির (Whigs) সাথে সম্পৃক্ত যারা নিয়ন্ত্রিত রাজতন্ত্রের (Limited Monarchy) সমর্থক ছিলেন।  সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই লকের সামাজিক চুক্তি ছিলো হবসের থেকে আলাদা এই ভিত্তিতে যে, লক রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে (absolute Monarchy) প্রতিরোধ করা জনগনের দাবীকে সমর্থন করছিলেন।

তথ্যসূত্রঃ

1.Evers M. WILLIAMSON(1977), SOCIAL CONTRACT: A CRITIQUE,  journal of Libertarian Studies, Vol.1, No.3, pp-184-195, pergamon  press.

2.  Mouritz,Thomas(2010), COMPARING THE SOCIAL CONTRACTS OF HOBBES AND LOCKE, The Western Australian Jurist,Vol.1

3. Elahi.Manzoor, What is Social Contract Theory?, Sophia Project.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *